“বাংলাদেশের সর্বকালের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা আপনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে আপনার অবদান আপনার শত্রুও স্বীকার করবে। কিন্তু আপনার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সাত মাসের রাজনীতিটাই বড় হয়ে গেল এবং এর জন্য আপনি ভুগছেন। এটা কতটা অপ্রত্যাশিত?”
এক সাক্ষাৎকারদাতার প্রশ্নে,ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সাকিব আল হাসানের কণ্ঠ ভেসে আসে— “শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, আমার কাছে অগ্রহণযোগ্যও। কিন্তু এটা নিয়ে আর কীই-বা বলব! আপনি তো তা-ও বলছেন যে সাত মাস রাজনীতির কথা । অনেকে তো বলে যে একটা ফেসবুক পোস্ট না দেওয়াতেই নাকি আমার এই দশা … মানে কী একটা অবস্থা!”
এই “কী একটা অবস্থা” — হয়তো এই চার শব্দেই লুকিয়ে আছে সাকিব আল হাসানের পুরো জীবন।
People are not born heroes or villains; they are born people, and the world decides what to call them.”
লাইনটা যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায় সাকিব আল হাসানের জীবনের সঙ্গে। একসময় যাকে বাংলাদেশ দেখেছে অলৌকিক প্রতিভা হিসেবে, পরে তাকেই কেউ বলেছে অহংকারী, কেউ বিতর্কিত, কেউ আবার দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। যেন তিনি একই সঙ্গে নায়কও, খলনায়কও। আর ঠিক এখানেই সাকিব আল হাসানের গল্পটা আলাদা।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন প্রতিভা দ্বিতীয়টি আসেনি। ক্রিকেট বিশ্বে অলরাউন্ডার এসেছে অনেক, কিন্তু তিন ফরম্যাটেই এক নম্বর অলরাউন্ডার হওয়ার মতো দানবীয় ধারাবাহিকতা খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছে। সাকিব সেই বিরলদের একজন। এমন একজন, যিনি একই ম্যাচে ব্যাট হাতে সেরা, বল হাতে সেরা, আবার কখনো দলের সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার ক্রিকেটারও।
তিনি নিজেই বলেছেন,
“বাংলাদেশের হিসাবে সময়ের আগে আমি অনেক কিছু করে ফেলছি।”
লাইনটা অহংকারের মতো শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটে ফ্র্যাঞ্চাইজি সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং, ক্রিকেটারের স্বাধীনতা—এই ধারণাগুলো সবার আগে স্বাভাবিক করেছিলেন সাকিবই। আজ যেটা সাধারণ, একসময় সেটার জন্য তাকেই “দেশদ্রোহী” বলা হয়েছিল।
মাগুরার ফয়সাল থেকে “সাকিব আল হাসান” হয়ে ওঠার গল্পটা সিনেমার মতো।
১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ মাগুরায় জন্ম নেওয়া সাকিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খেলাপাগল। গ্রামের মাঠে তাঁর প্রতিভা এতটাই আলাদা ছিল যে বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে ভাড়া করে খেলতে নিয়ে যাওয়া হতো। এক স্থানীয় ম্যাচে তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ এক আম্পায়ার তাঁকে মাগুরার ইসলামপুর পাড়া ক্লাবে অনুশীলনের সুযোগ করে দেন। সেখানেই সত্যিকারের ক্রিকেট বলে জীবনের প্রথম বল করেই উইকেট তুলে নেন সাকিব। টেপ টেনিস থেকে উঠে আসা ছেলেটি খুব দ্রুতই ব্যাট ও বল—দুই হাতেই নিজের আলাদা সামর্থ্যের জানান দিতে শুরু করেন।
এরপর বিকেএসপিতে স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ, খুলনা বিভাগে সুযোগ এবং খুব অল্প বয়সেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক। ২০০৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে মাত্র ৮৬ বলে সেঞ্চুরি ও তিন উইকেট নিয়ে সাকিব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—বাংলাদেশ ক্রিকেট এক অসাধারণ প্রতিভাকে পেতে যাচ্ছে।
ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন,
“দুনিয়ার কোনো শক্তিই সেই ধারণাকে থামাতে পারে না, যার সময় এসে গেছে।”
সাকিবের সময়টাও তখন এসে গিয়েছিল। বিকেএসপির মাত্র ছয় মাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু নিবিড় প্রশিক্ষণ সাকিবের ভেতরের বারুদকে আরও ধারালো করে তোলে।
২০০৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ অভিষেকেই ৩ উইকেট নিয়ে সাকিবের পথচলা শুরু। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮২ এবং ফাইনালে ৮৬ বলে সেঞ্চুরির সাথে ৩ উইকেট নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। যুব ওয়ানডেতে ১৮ ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৫৬৩ রান ও ২২ উইকেট। ১৭ বছর বয়সে খুলনার হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের পর, ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে নিজের জাত চেনান।
সাকিবের এই শুরুর দিনগুলো দেখে বিখ্যাত কবি টি এস এলিয়টের সেই লাইনটি মনে পড়ে যায়—
“Home is where one starts from.”
নিজের ঘরোয়া ভিতটা তিনি এতটাই শক্ত করে গড়েছিলেন যে বিশ্ব জয় করা তাঁর জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল।
সাকিব আল হাসান বিশ্ব ক্রিকেটের এক যাযাবর ফেরিওয়ালা (Globetrotter)। বোর্ডের অনাপত্তিপত্র (NOC) জটিলতায় পিএসএল বা এলপিএলের বেশ কিছু আসরে খেলতে না পারলেও, ২০২৩ লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে গল মার্ভেলসের হয়ে ২১ বলে ৩০ রান ও ২ উইকেট নিয়ে চেনা দাপট দেখান। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২০ সালের বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে ফিরেই তিনি গড়েন অনন্য ইতিহাস; বিশ্বের মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে ৫০০০ রান ও ৩০০ উইকেটের মহাকাব্যিক অলরাউন্ড ডাবল অর্জন করেন।
২০২২ স্বাধীনতা কাপেও তিনি ব্যাটে-বলে দলকে দুর্দান্ত জয় এনে দেন। বিতর্ক কিংবা মাঠের বাইরের ঝড়—কোনো কিছুই তাঁর ভেতরের ক্রিকেটার সত্ত্বাকে দমাতে পারেনি; তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতোই ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ডানা মেলে আকাশে ওড়াটায় তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি।
সাকিব আল হাসান কখনো নিজেকে কেবল ২২ গজের বৃত্তে আটকে রাখেননি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর তাঁর জীবন আরও বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর কিংবা হুয়াওয়ের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সাথে যুক্ত থেকে তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। একই সাথে মোনার্ক হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্পোরেট জগতে পা রাখা কিংবা ‘বুরাক কমোডিটিজ’-এর মাধ্যমে স্বর্ণের ব্যবসায় প্রবেশ—সাকিব মাঠের বাইরের জীবনেও এক রোমাঞ্চকর অলরাউন্ডার হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মাঠের বাইরের এই বাউন্সারগুলো সামলানো তাঁর জন্য ক্রিকেটের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল।
সাকিবের জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি ছিল সম্ভবত রাজনীতি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ শহর মাগুরা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, মাত্র সাত মাস পরেই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সংসদ ভেঙে দিলে তাঁর সাংসদ পদের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মুনোয়ার হোসেন খান নির্বাচিত হলে সাকিবের রাজনৈতিক অধ্যায়ের ওপর যবনিকা পড়ে।
বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ লিখেছিলেন,
“রাজনীতি হলো অজ্ঞদের দ্বারা চালিত এবং জ্ঞানীদের দ্বারা শাসিত হওয়ার এক নির্মম প্রক্রিয়া।”
সাকিব হয়তো সেই নির্মমতারই মুখোমুখি হয়েছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ চাঁছাছোলা ভাষায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন:
“একটা সময় দেখতাম যে সবাই আওয়ামী লীগ করে, আর এখন দেখি যে কেউই আওয়ামী লীগ করে না। এরকম একটা অবস্থা।”
যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় খেলোয়াড়ি জীবনেই কেন রাজনীতিতে এলেন, তখন মাঠের অহংকারী সাকিব মুহূর্তেই মাগুরার সেই চেনা ছেলেটি হয়ে যান।
আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,
“কখনো মাগুরাতে সাকিব আল হাসান হইনি। আমি সবসময় মাগুরাতে ফয়সালেই ছিলাম।” রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে চারপাশের তীব্র সমালোচনার জবাবে তিনি এখনো নিজের অবস্থানে অনড়, অকপটে বলেন, “আমি মনে করি যে আমি ভুল কিছু করি নাই।”
রাজনীতির পালাবদলের পর সাকিবের ওপর নেমে আসে একের পর এক আইনি ও আর্থিক খড়্গ। আড়াইশ কোটি টাকার পুঁজিবাজার কারসাজির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর সমস্ত নথিপত্র জব্দ করে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুদ্ধ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই চক্রে তিনি সক্রিয় ছিলেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই তদন্ত ও মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে বর্তমানে সাকিবের জীবন কাটছে দূর পরবাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
একদা মিরপুর স্টেডিয়ামে যার এক নজর দর্শনের জন্য হাজারো মানুষ ভিড় করত, আজ সেখানে ফেরার পথটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় গোলকধাঁধা। আগামীতে দেশে ফিরলে প্রথমে কোথায় যাবেন—মাগুরা নাকি মিরপুর? এমন প্রশ্নের জবাবে সাকিবের কণ্ঠে ঝরে পড়ে এক বুক হাহাকার:
“এখন তো ঢাকায় পা রাখাটাই সবচেয়ে বড় চিন্তা।”
অন্যদিকে দেশের ক্রিকেট বোর্ডেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সাকিবেরই এক সময়ের সতীর্থ ও বন্ধু তামিম ইকবাল এখন ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। বন্ধুর নেতৃত্বাধীন এই নতুন বোর্ড নিয়ে সাকিব অবশ্য আশাবাদী, তিনি মনে করেন নির্বাচনের পর যে নতুন বোর্ড আসবে, তাদের হাতে চিন্তাভাবনা করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট সময় থাকবে।
অন্যদিকে দেশের ক্রিকেট বোর্ডেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সাকিবেরই এক সময়ের সতীর্থ ও বন্ধু তামিম ইকবাল এখন ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি। বন্ধুর নেতৃত্বাধীন এই নতুন বোর্ড নিয়ে সাকিব অবশ্য আশাবাদী, তিনি মনে করেন নির্বাচনের পর যে নতুন বোর্ড আসবে, তাদের হাতে চিন্তাভাবনা করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথেষ্ট সময় থাকবে।
আমেরিকান লেখক এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড লিখেছিলেন,
“Show me a hero and I’ll write you a tragedy.” (আমাকে একজন নায়ক দেখাও, আমি তোমাকে একটি ট্র্যাজেডি লিখে দেব)।
সাকিব আল হাসানের জীবনও যেন এক আধুনিক ট্র্যাজেডি। যিনি একই সাথে বীর, একই সাথে খলনায়ক; কখনো ট্র্যাজিক হিরো, আবার কখনো বিতর্কের রাজা।
