ইতালীয় ফুটবলের ‘বিশ্বকাপহীন’ ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘস্থায়ী এক অভিশাপের বিতর্ক

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ২০০৬ সালের ৯ জুলাইয়ের রাতটি যেন এক দ্বান্দ্বিক স্মৃতি। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে জিনেদিন জিদানের বিদায়লগ্নের সেই বিখ্যাত ‘হেডবাট’ ও ইতালির বিশ্বকাপ জয়—ফুটবল প্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয়। কিন্তু সেই জয়ের উল্লাসের আড়ালে যে ইতালীয় ফুটবলের জন্য দীর্ঘ এক ‘অভিশাপ’ লুকিয়ে ছিল, তা যেন আজ দুই দশক পরে এসে আরও স্পষ্ট। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি সেই গৌরবের শিরোপা জয়ের পর থেকেই বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের ছন্দ হারিয়েছে। টানা ১২ বছর বিশ্বকাপের মূল পর্বে ইতালিবিহীন থাকা আজ্জুরিদের এই বর্তমান দুর্দশা কেবল মাঠের পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি ফুটবল ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি। ২০০৬ সালের সেই শ্রেষ্ঠত্বের পর থেকেই ইতালির পারফরম্যান্সে এক ভয়াবহ ধস নেমেছে। ২০১০ এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে না পারা ছিল কেবল প্রারম্ভিক ব্যর্থতা। এর পরের চিত্রটি ছিল আরও করুণ; ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইতালি বাছাইপর্বের গণ্ডি পেরোতেই ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে সুইডেন এবং নর্থ মেসিডোনিয়ার মতো দলের কাছে হেরে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়া চারবারের চ্যাম্পিয়নদের জন্য ছিল এক বিশাল অপমান। ফুটবল বোদ্ধারা একে ‘নতুন প্রজন্মের অভাব’ বা ‘সিরি আ-র কাঠামোগত দুর্বলতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, ইতালীয় সমর্থকদের একাংশ একে দেখছে এক অলৌকিক নিয়তির লিখন হিসেবে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, জিদানকে মাঠ থেকে বিদায় করার সেই বিতর্কিত ফাইনাল জয়ের পর থেকেই ইতালীয় ফুটবলের ওপর যেন এক ধরনের অশুভ ছায়া ভর করেছে। ইতালির এই দীর্ঘ পতনের পেছনে অবশ্য গভীর কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে। ইতালীয় তরুণ প্রতিভার লালনের অভাব, রক্ষণাত্মক ফুটবল থেকে আধুনিক গতিময় আক্রমণে রূপান্তরের ধীরগতি এবং বড় টুর্নামেন্টের চরম স্নায়ুচাপ সামলাতে বর্তমান দলের অক্ষমতা আজ্জুরিদের পতনের মূল কারণ। একসময় যারা ছিল বিশ্ব ফুটবলের রক্ষণভাগের অজেয় দুর্গ, তারা এখন নিজেদের ঘরেই পথ হারিয়েছে। সিরি আ-তে বিদেশি খেলোয়াড়দের আধিপত্য ও স্থানীয় ফুটবলারদের সীমিত সুযোগ তাদের জাতীয় দলের গভীরতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জিদানের সেই বিদায়লগ্নে পাওয়া জয়টি হয়তো ছিল ভাগ্যের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি, কিন্তু তার পরবর্তী দুই দশকের পারফরম্যান্স বলে দেয়, ইতালি তাদের ঐতিহ্যগত শৃঙ্খলা ও ফুটবলীয় দর্শনকে অনেকটাই বিসর্জন দিয়েছে। ইতালির ফুটবল ইতিহাসে বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর নজির থাকলেও, বর্তমান সময়ে বিশ্বফুটবলে ইতালি যেন এক হারিয়ে যাওয়া শক্তি। বিশ্বকাপের মাঠে ইতালির রক্ষণভাগের শৈল্পিক লড়াই ও লড়াকু মানসিকতা দর্শক আজ তীব্রভাবে অনুভব করছে। বার্লিনের সেই গৌরবময় স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ইতালি কি পারবে নতুন কোনো রূপকল্প তৈরি করতে? নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা কি সেই পুরনো ‘অভিশাপ’ ভেঙে আজ্জুরিদের নতুন কোনো ভোরের স্বপ্ন দেখাতে পারবে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় আছে বিশ্বজুড়ে থাকা অগণিত ফুটবল প্রেমী। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বিশ্বমঞ্চে ইতালির মতো ঐতিহ্যবাহী দলের অনুপস্থিতি সবসময়ই ফুটবলের জৌলুসকে খানিকটা হলেও ফিকে করে দেয়। ইতালির জন্য এখন সময় এসেছে রূপকথার গল্প ছেড়ে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করার।
একটি হেডবাট, এক বিশ্বকাপ, এক কিংবদন্তির বিতর্কিত বিদায়

ফুটবল ইতিহাসে খুব কম মুহূর্তই আছে যা ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফরাসি অধিনায়ক জিনেদিন জিদান এবং ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো এত বিতর্ক, আবেগ এবং দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০০৬ সালের ৯ জুলাই, বার্লিনের অলিম্পিয়াস্টাডিয়নে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী জড়ো হয়েছিল এমন এক মুহূর্তের সাক্ষী হতে, যা অনেকের ধারণা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের গৌরবময় বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখবে। কিন্তু সেই ম্যাচ শেষ পর্যন্ত জন্ম দেয় এমন একটি দৃশ্যের, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে স্কোর ছিল ১-১। পেনাল্টি শুটআউটের সম্ভাবনা সামনে রেখে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে, আর মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক তখনই ঘটে সেই ঘটনা, যা বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শককে স্তম্ভিত করে দেয়। হঠাৎ করেই জিদান ঘুরে দাঁড়িয়ে মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন। ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, আর পুরো স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময় ও বিভ্রান্তি। কিছুক্ষণ পর ম্যাচ কর্মকর্তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে জিদানকে লাল কার্ড দেখানো হয়। এটাই ছিল তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। লাল কার্ড পাওয়ার পর যখন জিদান ধীরে ধীরে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটছিলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রতীকী এক দৃশ্য—একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তা বিজয়ের উল্লাসে নয়; বরং বিতর্কের আবহে। বহু বছর ধরে এই প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—মাতেরাজ্জি ঠিক কী বলেছিলেন, যা জিদানকে এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করেছিল? পরবর্তীতে দুই খেলোয়াড়ের বক্তব্য থেকে ঘটনার কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মাতেরাজ্জি স্বীকার করেন যে তিনি কথোপকথনের সময় জিদানের বোনকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। পরে তিনি সেই মন্তব্যকে “বোকামিপূর্ণ” বলে উল্লেখ করেন, যদিও তার দাবি ছিল এমন মন্তব্য কখনোই শারীরিক আক্রমণের কারণ হতে পারে না। অন্যদিকে জিদানের ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন। ফরাসি কিংবদন্তি জানান, তার পরিবার—বিশেষ করে তার মা ও বোনকে নিয়ে করা অপমানজনক মন্তব্য তার ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করেছিল। তিনি বলেন, এমন মন্তব্য তাকে শারীরিক সংঘর্ষের চেয়েও বেশি আঘাত করেছিল। ফলে ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি ফুটবল বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সম্মান, মর্যাদা এবং আবেগের সীমা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দেয়। ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই লাল কার্ড ফ্রান্সের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। জিদান ইতোমধ্যেই পেনাল্টি থেকে দলের হয়ে গোল করেছিলেন এবং পুরো দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় ছিলেন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তার অনুপস্থিতি ফ্রান্সকে তাদের নেতা, সবচেয়ে অভিজ্ঞ পেনাল্টি শুটার এবং মানসিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারানোর সমান ছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে ইতালি ৫-৩ ব্যবধানে জয়ী হয়ে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, জিদান যদি মাঠে থাকতেন, তাহলে ফলাফল ভিন্নও হতে পারত। যদিও এ ধরনের আলোচনা অনুমানের পর্যায়ে পড়ে, তবে এ বিষয়ে খুব কমই দ্বিমত রয়েছে যে অধিনায়কের বিদায় ফ্রান্সকে বড় ধরনের অসুবিধায় ফেলেছিল। প্রায় দুই দশক পরও এই ঘটনাকে ঘিরে মতভেদ রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল একজন মহান খেলোয়াড়ের ক্ষণিকের আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা, যা তার অসাধারণ ক্যারিয়ারের ওপর একটি বিতর্কিত ছাপ ফেলে দিয়েছে। তাদের যুক্তি, পরিস্থিতি যতই উত্তেজনাপূর্ণ হোক না কেন, জিদানের মতো একজন খেলোয়াড়ের উচিত ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচে নিজের সংযম ধরে রাখা। অন্যদিকে অনেকেই ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তাদের মতে, এটি কেবল হতাশা বা রাগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং পরিবারের প্রতি করা অপমানজনক মন্তব্যের বিরুদ্ধে আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বসেরা ক্রীড়াবিদরাও শেষ পর্যন্ত মানুষ, এবং মানুষের মতো তারাও আবেগের সীমায় পৌঁছাতে পারেন। এ কারণেই ঘটনাটি আজও আলোচনায় রয়েছে। এটি পেশাদার দায়িত্ববোধ এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এই দুই আদর্শের সংঘর্ষকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু ইতালির শিরোপা জয়ের জন্য স্মরণীয় নয়; এটি স্মরণীয় কারণ ম্যাচটি বিশ্বকে দেখিয়েছিল এলিট পর্যায়ের খেলাধুলার মানবিক দিকটিও। জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কোনো বিজয়সূচক গোল বা ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্ত দিয়ে শেষ হয়নি। বরং শেষ হয়েছিল এমন এক ঘটনায়, যা আজও ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং আবেগের জন্ম দেয়। এটিকে কেউ ক্ষমার অযোগ্য ভুল হিসেবে দেখেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত অপমানের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ব্যাখ্যা যাই হোক, ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে। প্রায় বিশ বছর পরও সেই দৃশ্যটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে লাল কার্ড দেখার পর বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন জিনেদিন জিদান। এটি এমন এক বিদায়ের প্রতীক, যা শুধু সাফল্য ও প্রতিভার গল্প নয়; বরং মানবিক আবেগ, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এবং পেশাদার প্রতিযোগিতার জটিল সম্পর্কেরও এক চিরস্থায়ী স্মারক।
সাত মাসের রাজনীতি কি মুছে দিল দুই দশকের ক্রিকেট গৌরব? | সাকিব আল হাসানের গল্প

“বাংলাদেশের সর্বকালের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা আপনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে আপনার অবদান আপনার শত্রুও স্বীকার করবে। কিন্তু আপনার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সাত মাসের রাজনীতিটাই বড় হয়ে গেল এবং এর জন্য আপনি ভুগছেন। এটা কতটা অপ্রত্যাশিত?” এক সাক্ষাৎকারদাতার প্রশ্নে,ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সাকিব আল হাসানের কণ্ঠ ভেসে আসে— “শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, আমার কাছে অগ্রহণযোগ্যও। কিন্তু এটা নিয়ে আর কীই-বা বলব! আপনি তো তা-ও বলছেন যে সাত মাস রাজনীতির কথা । অনেকে তো বলে যে একটা ফেসবুক পোস্ট না দেওয়াতেই নাকি আমার এই দশা … মানে কী একটা অবস্থা!” এই “কী একটা অবস্থা” — হয়তো এই চার শব্দেই লুকিয়ে আছে সাকিব আল হাসানের পুরো জীবন। People are not born heroes or villains; they are born people, and the world decides what to call them.” লাইনটা যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায় সাকিব আল হাসানের জীবনের সঙ্গে। একসময় যাকে বাংলাদেশ দেখেছে অলৌকিক প্রতিভা হিসেবে, পরে তাকেই কেউ বলেছে অহংকারী, কেউ বিতর্কিত, কেউ আবার দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। যেন তিনি একই সঙ্গে নায়কও, খলনায়কও। আর ঠিক এখানেই সাকিব আল হাসানের গল্পটা আলাদা। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন প্রতিভা দ্বিতীয়টি আসেনি। ক্রিকেট বিশ্বে অলরাউন্ডার এসেছে অনেক, কিন্তু তিন ফরম্যাটেই এক নম্বর অলরাউন্ডার হওয়ার মতো দানবীয় ধারাবাহিকতা খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছে। সাকিব সেই বিরলদের একজন। এমন একজন, যিনি একই ম্যাচে ব্যাট হাতে সেরা, বল হাতে সেরা, আবার কখনো দলের সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার ক্রিকেটারও। তিনি নিজেই বলেছেন, “বাংলাদেশের হিসাবে সময়ের আগে আমি অনেক কিছু করে ফেলছি।” লাইনটা অহংকারের মতো শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটে ফ্র্যাঞ্চাইজি সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং, ক্রিকেটারের স্বাধীনতা—এই ধারণাগুলো সবার আগে স্বাভাবিক করেছিলেন সাকিবই। আজ যেটা সাধারণ, একসময় সেটার জন্য তাকেই “দেশদ্রোহী” বলা হয়েছিল। মাগুরার ফয়সাল থেকে “সাকিব আল হাসান” হয়ে ওঠার গল্পটা সিনেমার মতো। ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ মাগুরায় জন্ম নেওয়া সাকিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খেলাপাগল। গ্রামের মাঠে তাঁর প্রতিভা এতটাই আলাদা ছিল যে বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে ভাড়া করে খেলতে নিয়ে যাওয়া হতো। এক স্থানীয় ম্যাচে তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ এক আম্পায়ার তাঁকে মাগুরার ইসলামপুর পাড়া ক্লাবে অনুশীলনের সুযোগ করে দেন। সেখানেই সত্যিকারের ক্রিকেট বলে জীবনের প্রথম বল করেই উইকেট তুলে নেন সাকিব। টেপ টেনিস থেকে উঠে আসা ছেলেটি খুব দ্রুতই ব্যাট ও বল—দুই হাতেই নিজের আলাদা সামর্থ্যের জানান দিতে শুরু করেন। এরপর বিকেএসপিতে স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ, খুলনা বিভাগে সুযোগ এবং খুব অল্প বয়সেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক। ২০০৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে মাত্র ৮৬ বলে সেঞ্চুরি ও তিন উইকেট নিয়ে সাকিব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—বাংলাদেশ ক্রিকেট এক অসাধারণ প্রতিভাকে পেতে যাচ্ছে। ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, “দুনিয়ার কোনো শক্তিই সেই ধারণাকে থামাতে পারে না, যার সময় এসে গেছে।” সাকিবের সময়টাও তখন এসে গিয়েছিল। বিকেএসপির মাত্র ছয় মাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু নিবিড় প্রশিক্ষণ সাকিবের ভেতরের বারুদকে আরও ধারালো করে তোলে। ২০০৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ অভিষেকেই ৩ উইকেট নিয়ে সাকিবের পথচলা শুরু। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮২ এবং ফাইনালে ৮৬ বলে সেঞ্চুরির সাথে ৩ উইকেট নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। যুব ওয়ানডেতে ১৮ ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৫৬৩ রান ও ২২ উইকেট। ১৭ বছর বয়সে খুলনার হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের পর, ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে নিজের জাত চেনান। সাকিবের এই শুরুর দিনগুলো দেখে বিখ্যাত কবি টি এস এলিয়টের সেই লাইনটি মনে পড়ে যায়— “Home is where one starts from.” নিজের ঘরোয়া ভিতটা তিনি এতটাই শক্ত করে গড়েছিলেন যে বিশ্ব জয় করা তাঁর জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল। সাকিব আল হাসান বিশ্ব ক্রিকেটের এক যাযাবর ফেরিওয়ালা (Globetrotter)। বোর্ডের অনাপত্তিপত্র (NOC) জটিলতায় পিএসএল বা এলপিএলের বেশ কিছু আসরে খেলতে না পারলেও, ২০২৩ লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে গল মার্ভেলসের হয়ে ২১ বলে ৩০ রান ও ২ উইকেট নিয়ে চেনা দাপট দেখান। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২০ সালের বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে ফিরেই তিনি গড়েন অনন্য ইতিহাস; বিশ্বের মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে ৫০০০ রান ও ৩০০ উইকেটের মহাকাব্যিক অলরাউন্ড ডাবল অর্জন করেন। ২০২২ স্বাধীনতা কাপেও তিনি ব্যাটে-বলে দলকে দুর্দান্ত জয় এনে দেন। বিতর্ক কিংবা মাঠের বাইরের ঝড়—কোনো কিছুই তাঁর ভেতরের ক্রিকেটার সত্ত্বাকে দমাতে পারেনি; তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতোই ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ডানা মেলে আকাশে ওড়াটায় তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। সাকিব আল হাসান কখনো নিজেকে কেবল ২২ গজের বৃত্তে আটকে রাখেননি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর তাঁর জীবন আরও বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর কিংবা হুয়াওয়ের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সাথে যুক্ত থেকে তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। একই সাথে মোনার্ক হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্পোরেট জগতে পা রাখা কিংবা ‘বুরাক কমোডিটিজ’-এর মাধ্যমে স্বর্ণের ব্যবসায় প্রবেশ—সাকিব মাঠের বাইরের জীবনেও এক রোমাঞ্চকর অলরাউন্ডার হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মাঠের বাইরের এই বাউন্সারগুলো সামলানো তাঁর জন্য ক্রিকেটের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। সাকিবের জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি ছিল সম্ভবত রাজনীতি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ শহর মাগুরা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, মাত্র সাত মাস পরেই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সংসদ ভেঙে দিলে তাঁর সাংসদ পদের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মুনোয়ার হোসেন খান নির্বাচিত হলে সাকিবের রাজনৈতিক অধ্যায়ের ওপর যবনিকা পড়ে। বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ লিখেছিলেন, “রাজনীতি হলো অজ্ঞদের দ্বারা চালিত এবং জ্ঞানীদের দ্বারা শাসিত হওয়ার এক নির্মম প্রক্রিয়া।” সাকিব হয়তো সেই নির্মমতারই মুখোমুখি হয়েছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ চাঁছাছোলা ভাষায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন: “একটা সময় দেখতাম যে সবাই আওয়ামী লীগ করে, আর এখন দেখি যে কেউই আওয়ামী লীগ করে না। এরকম একটা অবস্থা।” যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় খেলোয়াড়ি জীবনেই কেন রাজনীতিতে এলেন, তখন মাঠের অহংকারী সাকিব মুহূর্তেই মাগুরার সেই চেনা ছেলেটি হয়ে যান। আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “কখনো মাগুরাতে সাকিব আল হাসান হইনি। আমি সবসময় মাগুরাতে ফয়সালেই ছিলাম।” রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে চারপাশের তীব্র সমালোচনার জবাবে তিনি এখনো নিজের অবস্থানে অনড়, অকপটে বলেন, “আমি মনে করি যে আমি ভুল কিছু করি নাই।” রাজনীতির পালাবদলের পর সাকিবের ওপর নেমে আসে একের পর এক আইনি ও আর্থিক খড়্গ। আড়াইশ কোটি টাকার পুঁজিবাজার কারসাজির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর সমস্ত নথিপত্র জব্দ করে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুদ্ধ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই চক্রে তিনি সক্রিয় ছিলেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই তদন্ত ও মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে বর্তমানে সাকিবের জীবন কাটছে দূর পরবাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। একদা মিরপুর স্টেডিয়ামে যার এক নজর দর্শনের জন্য হাজারো মানুষ ভিড় করত, আজ সেখানে ফেরার পথটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় গোলকধাঁধা। আগামীতে দেশে ফিরলে প্রথমে