একটি প্রশ্ন, শত উত্তর। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এমন একটি দৃশ্য দেখা গেল, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকদের একইভাবে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মোট ৪৪টি সক্রিয় রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ১৩টি ইসলামপন্থী দল ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট নামের এই দীর্ঘ তালিকা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: একটিমাত্র ধর্মের নামে, মাত্র একটি দেশে, এত বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব হলো কীভাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে চলবে না। এই বিভক্তির বীজ ছড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের মাটিতে, ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত এবং মুসলিম পরিচয়ের সংকটে, পাকিস্তান আন্দোলনের আদর্শিক তর্কে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিতে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী আলি রিয়াজের ভাষায়, “বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি কখনো একক বা একজাতীয় ছিল না এটি সবসময়ই বহুস্তরীয় এবং প্রতিযোগিতামূলক।এই নিবন্ধটি সেই বহুস্তরীয় ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা।
ঔপনিবেশিক শাসন ও মুসলমানের পতন
১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার মুসলমান সমাজ এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান শাসকশ্রেণির হাত থেকে ক্ষমতা, ভূমি এবং প্রশাসনিক পদ একে একে চলে যায় হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ব্রিটিশ নিযুক্ত আমলাদের কাছে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে মডার্ন ইন্ডিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থ চ্যাটার্জি পর্যন্ত সকলেই এই পতনের ব্যাপ্তিকে স্বীকার করেছেন।
১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর গ্রামাঞ্চলের মুসলমান কৃষক সমাজের উপর হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ ইন্ডিগো চাষীদের শোষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পটভূমিতেই উদ্ভব হয় বাংলার প্রথম সংগঠিত ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের।
ফরায়েজী আন্দোলন:
১৮১৮ সালে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। আন্দোলনটির লক্ষ্য ছিল ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব বা ফরজ পালনের উপর জোর দিয়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী চর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং অনৈসলামিক প্রথা দূর করা। মক্কায় দীর্ঘ অধ্যয়নের পর দেশে ফিরে শরীয়তউল্লাহ বাংলার মুসলমান কৃষকদের দুর্দশা এবং ধর্মীয় বিচ্যুতি দেখে মর্মাহত হন। তাঁর সংস্কার কার্যক্রম ছিল মূলত পীর ও মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলামের বিরুদ্ধে যা বাংলার সুফি ধারার সাথে তাঁর মৌলিক বিরোধ তৈরি করে।
তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নেয় ঔপনিবেশিক করব্যবস্থা, জমিদারী শোষণ এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে জমিদারদের আঁতাতের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ হিসেবে বিকশিত হয়।
ফরায়েজী আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: এটি প্রথমবারের মতো বাংলার মুসলমান সমাজকে দুটি ধারায় বিভক্ত করে একদিকে সংস্কারবাদী বা ‘শুদ্ধবাদী’ ইসলাম, অন্যদিকে সুফি ও পীরকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলাম। এই বিভাজন আজও বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্তর্গত বিরোধের একটি মূল উৎস।
একই সময়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি ধারার আন্দোলন আরেকটি পৃথক ধারা তৈরি করে। ফরায়েজী ও ওয়াহাবি উভয়ই সংস্কারবাদী হলেও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য ছিল। এই প্রারম্ভিক বিভাজন পরবর্তী সকল বিভক্তির একটি আদিরূপ।
পীর ও তরিকতের প্রভাব
বাংলার ইসলামী রাজনীতিকে বুঝতে হলে সুফি তরিকা ও পীর-মুরিদ সম্পর্কের সামাজিক শক্তিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক অধ্যাপক আযীযুর রহমান মল্লিক তাঁর ‘British Policy and the Muslims in Bengal’গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার হয়েছিল মূলত সুফি শায়খদের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়। ফলে মুরিদদের উপর পীরের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব গ্রামীণ সমাজে এত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল যে, যেকোনো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে এই কাঠামোর সাথে লড়াই করেই এগোতে হয়েছে।
পীরকেন্দ্রিক রাজনীতির এই উত্তরাধিকারই পরবর্তীকালে চরমোনাই পীর, আটরশি পীর এবং অন্যান্য দরগাহকেন্দ্রিক পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেবে।
আলিগড় আন্দোলন ও বাংলার মুসলমান
উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে ব্রিটিশ শাসনের সাথে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানায়। বাংলায় এর প্রভাব পড়েছিল শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের বৃহত্তর অংশ কৃষক, মাদ্রাসাশিক্ষিত আলেম, এবং পীরের মুরিদ এই সংস্কারধারার সাথে সম্পর্কিত অনুভব করেননি। ফলে শুরু থেকেই বাংলার ইসলামী আন্দোলনে একটি শ্রেণিগত ও শিক্ষাগত বিভাজন বিদ্যমান ছিল।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম রাজনীতির উদ্ভব
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা বাংলার মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে স্বাগত হয়েছিল, কারণ নতুন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকা হলো নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়।
কিন্তু মুসলিম লিগও কখনো একক ও অখণ্ড ছিল না। একদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, পাশ্চাত্যশিক্ষিত আলিগড়পন্থী নেতৃবৃন্দ, অন্যদিকে পূর্ববাংলার কৃষক সমাজ এবং দেওবন্দি আলেমদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক হাসান নূরুল এই বিভাজনকে “ইসলামী রাজনীতির দুই নদীর মোহানা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একটি ধারা ছিল আধুনিক, জাতি-রাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে, অন্যটি ছিল ধর্মীয় আইন ও খেলাফত-ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে আবদ্ধ।
খেলাফত আন্দোলন ও তার পরিণতি
১৯১৯-২৪ সালের খেলাফত আন্দোলন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ এনেছিল। ইসলামী বিশ্বের খলিফার সুরক্ষার দাবিতে মুসলমান ও হিন্দু এক মঞ্চে এলেও, তুরস্কে খেলাফতের বিলোপের পর এই আন্দোলন ভেঙে পড়ে। এর পরিণতি হয় মুসলিম রাজনীতির আরও বেশি বিভক্তি কেউ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ফেরেন, কেউ কেবল ধর্মীয় পুনর্জাগরণে মনোনিবেশ করেন, আর কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে যান।
জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও মওদূদীর আদর্শ
১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার আট দশক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা ‘হাকিমিয়্যাহ’-র ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দি ও সুফি ধারার সাথে কখনো পুরোপুরি মেলেনি।
কওমি-ভিত্তিক ইসলামপন্থী নেতারা যুক্তি দেন যে জামায়াতের ধর্মতাত্ত্বিক অভিমুখিতা তাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন মওদূদীর নবী ও সাহাবীদের বিষয়ে কিছু অভিমত তারা বিধর্মী বলে মনে করেন। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজন পরবর্তীকালে রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি করেছে।
পাকিস্তান আন্দোলনে জামায়াত সমর্থন দেয়নি, কারণ মওদূদী মনে করতেন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শ পূরণ করতে পারবে না। এই অবস্থান জামায়াতকে মুসলিম লিগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের আদর্শিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতি: দ্বন্দ্বময় পরিচয়
১৯৪৭-৭১ সালের পাকিস্তান যুগে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সমাজে একটি গভীর পরিচয়সংকট দেখা দেয়। প্রশ্নটি ছিল: তারা কি প্রথমে বাঙালি, নাকি প্রথমে মুসলমান?
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সংকটকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে বাঙালি মুসলমানরা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। রাজনীতিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আলী তাঁর Bengali Muslims and the Language Movement গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক দাবি ছিল না এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির একটি নতুন সংজ্ঞার সন্ধান।
এই সময় আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা ক্রমশ পাকিস্তানপন্থী অভিজাত শ্রেণির সাথে যুক্ত হয়, আর স্বতন্ত্র অর্থায়নে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বলয় তৈরি করে। বাংলাদেশে দুই ধরনের মাদ্রাসা বিদ্যমান: সরকারি নিয়ন্ত্রণে আলিয়া মাদ্রাসা এবং বেসরকারি ও সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসা।
মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলামী রাজনীতির বিপর্যয়
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিকে এক অভূতপূর্ব সংকটে ফেলে। জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়ে আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকার বাহিনী গঠনে সহায়তা করে। এই অবস্থান ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতির জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী নৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে এবং ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রের চার মূলনীতির একটি হিসেবে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ অন্তর্ভুক্ত হয়। জামায়াতের বহু নেতা পাকিস্তানে পালিয়ে যান, অনেকে গ্রেফতার হন। একটি সংগঠন হিসেবে জামায়াত বাংলাদেশে ছিল অবৈধ, অদৃশ্যপ্রায়।
কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা ইসলামী রাজনীতিকে ধ্বংস করেনি। বরং এটি ইসলামী শক্তিগুলোকে ভূগর্ভে পাঠিয়েছে এবং সেখান থেকে তারা নতুন নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে।
জিয়াউর রহমান ও ইসলামের রাজনৈতিক পুনর্বাসন
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমান ইসলামী রাজনীতির পুনর্বাসনের পথ খুলে দেন। সংবিধান থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়া হয় এবং ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ যুক্ত করা হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনরায় বৈধতা দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে ইসলামীকরণের প্রক্রিয়া জোরদার হয় এবং হোসাইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে তা আরও তীব্র হয়। ১৯৮৮ সালে এরশাদ ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন। এই পদক্ষেপটি ছিল মূলত রাজনৈতিক বৈধতার খোঁজে একটি সামরিক স্বৈরাচারের ধর্মীয় হাতিয়ার ব্যবহার।
উভয় সামরিক শাসক যারা ১৯৭৫ ও ১৯৮২ সালে ক্ষমতা দখল করেছিলেন রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের জন্য ইসলামীকরণের নীতি অনুসরণ করেন।
এই পুনর্বাসনের পরিণতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ইসলামী রাজনীতি বিকশিত হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ছিল শর্তসাপেক্ষ এবং একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক। ফলে যেসব ইসলামী শক্তি রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেল না, তারা নিজস্ব স্বাধীন সংগঠন গড়ে তুলল।
হাফেজ্জী হুজুর ও কওমি ধারার রাজনীতি
এই পর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো মাওলানা মুহাম্মদউল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের রাজনৈতিক আবির্ভাব। ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে হাফেজ্জী হুজুর দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ইসলামী রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেন। তিনি কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনৈতিক ধারার প্রতীক হয়ে ওঠেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন একটি পৃথক রাজনৈতিক মেরু তৈরি করে।
১৯৮৭ সালে হাফেজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর তাঁর তিনজন শিষ্য মুফতি আমিনী, চরমোনাই পীর ও মাওলানা আজিজুল হক পৃথক পৃথক রাজনৈতিক দল গঠন করেন। এটি বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির বিভক্তির সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ: একজন প্রভাবশালী নেতার মৃত্যু অন্তত তিনটি নতুন দলের জন্ম দেয়।
এই ঘটনা থেকে একটি কাঠামোগত প্রশ্ন উঠে আসে: বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো কি সত্যিকার অর্থে আদর্শভিত্তিক, নাকি ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক? উত্তর স্পষ্ট। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নেতার ব্যক্তিত্ব, তার পীরালির সিলসিলা বা ধর্মীয় কর্তৃত্ব দলের মেরুদণ্ড।
আদর্শিক বিভাজনের মানচিত্র
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির বিভক্তিকে বুঝতে হলে প্রধান আদর্শিক ধারাগুলোকে আলাদা করে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
১. জামায়াত-মওদূদী ধারা: রাজনৈতিক ইসলামের পদ্ধতিগত পন্থা
জামায়াতে ইসলামীর আদর্শ মওদূদীর দার্শনিক চিন্তার উপর প্রতিষ্ঠিত। মওদূদী মনে করতেন যে, আধুনিক গণতন্ত্র এবং জাতি-রাষ্ট্র ধারণা ইসলামের সার্বভৌমত্বের (হাকিমিয়্যাহ) সাথে সাংঘর্ষিক। তাঁর দর্শনে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ছিল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলমাত্র। এই ‘টপ-ডাউন’ পদ্ধতি প্রথমে নেতৃবর্গকে ইসলামীভাবে গড়ে তোলো, তারপর রাষ্ট্রকে জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামোকে তুলনামূলকভাবে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও কেন্দ্রীভূত রাখে।
কিন্তু কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক নেতারা সরাসরি বলেন: মওদূদীর নবী ও সাহাবীবিষয়ক কিছু অভিমত তারা গ্রহণযোগ্য মনে করেন না, এবং এটিই জামায়াতের সাথে তাদের রাজনৈতিক সহযোগিতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
২. দেওবন্দি ধারা: আলেমশ্রেণির রাজনীতি
দেওবন্দ মাদ্রাসার ঐতিহ্য থেকে উদ্ভূত এই ধারা বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসার মাধ্যমে বিস্তৃত। দেওবন্দি আলেমরা মনে করেন ধর্মীয় শিক্ষার বিশুদ্ধতা রক্ষাই প্রথম দায়িত্ব, এবং রাজনীতি সেই লক্ষ্যের সহায়ক মাত্র। এই ধারা থেকে জন্ম নিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম এবং একাধিক ছোট দল।
দেওবন্দি ধারার মধ্যেও বিভক্তি আছে। একটি অংশ মনে করে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ জরুরি, আরেকটি অংশ রাজনীতি থেকে দূরে থেকে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা ও সমাজসংস্কারে মনোযোগী।
৩. সুফি ও পীরকেন্দ্রিক ধারা
বাংলার গ্রামীণ সমাজে সুফি তরিকার প্রভাব এখনো গভীর। চরমোনাই পীর, ছারছিনার পীর এরা প্রত্যেকে নিজস্ব মুরিদ-নেটওয়ার্কের উপর ভিত্তি করে পৃথক রাজনৈতিক সত্তা গড়ে তুলেছেন। এই দলগুলো মূলত একজন পীরের নৈতিক কর্তৃত্বের উপর নির্ভরশীল, এবং একটি পীরের মৃত্যু বা দলীয় কোন্দল তাৎক্ষণিকভাবে বিভাজন ঘটায়।
জামায়াত একটি ইসলামী ঐক্যমঞ্চ ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল এবং পীরকেন্দ্রিক শক্তিগুলোকে আকৃষ্ট করতে তার প্রেসিডিয়ামের এক-চতুর্থাংশ আসন বিশিষ্ট পীরদের দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয়, কারণ পীরকেন্দ্রিক ধারা সবসময় জামায়াতের সাংগঠনিক কর্তৃত্বের অধীনে থাকতে অস্বীকার করেছে।
৪. সালাফি/আহলে হাদিস ধারা
উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশী শ্রমিকদের অভিবাসন এবং সৌদি অর্থায়নের মাধ্যমে সালাফি বা আহলে হাদিস ধারা বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করেছে। এই ধারা সুফি তরিকা, মাজার-পূজা এবং ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় আচারের বিরোধী ফলে এটি দেওবন্দি ও পীরকেন্দ্রিক ধারার সাথে সরাসরি সংঘাতে পড়ে। এই ধারার রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও, ধর্মীয় পরিমণ্ডলে তারা উল্লেখযোগ্য প্রভাব রাখে।
৫. হেফাজতে ইসলাম: মাদ্রাসাভিত্তিক গণআন্দোলন
হাটহাজারী মাদ্রাসার সাবেক পরিচালক শাহ আহমদ শফী, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী এবং মুফতি ইজহারুল ইসলামকে হেফাজতে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে গণ্য করা হয়। হেফাজত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু তার রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশের যেকোনো ইসলামী দলের চেয়ে বেশি।
২০১৩ সালে হেফাজত গণআন্দোলন সংগঠিত করে আওয়ামী লীগ সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানায়। সরকার পরবর্তীকালে হেফাজতের সাথে একাধিক সমঝোতায় পৌঁছায়। কিন্তু হেফাজতও একক নয় এর মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আলেম এবং ভিন্নমতাবলম্বীরা আছেন, যারা সংগঠনের ভেতরেই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত।
মাদ্রাসা: রাজনৈতিক কারখানা
২০১৫ সালে বাংলাদেশে ১৩,৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় প্রায় ১৪ লক্ষ শিক্ষার্থী এবং প্রায় ৭৪,০০০ শিক্ষক ছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় ছিল আরও ২৪ লক্ষের বেশি শিক্ষার্থী। এই বিশাল শিক্ষাব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র নয় এটি রাজনৈতিক জনশক্তির একটি বিশাল মজুদ।
কওমি মাদ্রাসাগুলোতে ইসলামের প্রকৃত অর্থের ব্যাখ্যার কর্তৃত্ব ঐতিহাসিকভাবে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আলেমদের হাতে। এটাই কওমি আলেমদের প্রকৃত শক্তির উৎস। প্রতিটি বড় মাদ্রাসা তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, সাবেক ছাত্র সংঘ এবং অর্থায়নের উৎস বজায় রাখে। ফলে প্রতিটি বড় মাদ্রাসা কার্যত একটি পৃথক রাজনৈতিক মেরু গঠনের সম্ভাবনা বহন করে।
নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনীতির প্যারাডক্স
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে একটি মৌলিক প্যারাডক্স হলো: দলগুলো দাবি করে তারা কুরআন ও সুন্নাহর আদর্শে পরিচালিত, কিন্তু বাস্তবে তারা প্রায়ই একজন করিশমাটিক নেতার ব্যক্তিত্বের উপর নির্ভরশীল।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সাক্ষাৎকার প্রদানকারী প্রতিটি ইসলামী দলের নেতা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোসহ তাদের দলের প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একজন সাম্প্রতিক ক্যারিশম্যাটিক প্রতিষ্ঠাতার কথা উল্লেখ করেছেন।
এর পরিণতি হলো: যখন একজন নেতা মারা যান বা দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন তাঁর উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং বিভক্তি ঘটে। হাফেজ্জী হুজুরের মৃত্যুর পর তিনটি দলের জন্ম এবং হেফাজতের শাহ আহমদ শফীর মৃত্যুর পর নেতৃত্বসংকট উভয়ই এই ধরনের উদাহরণ।
নির্বাচনী পদ্ধতি ও বিভক্তির সম্পর্ক
বাংলাদেশের প্রথম-পেরিয়ে-পোস্ট বা ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ নির্বাচন পদ্ধতি ছোট দলগুলোর জন্য অত্যন্ত প্রতিকূল। জামায়াতে ইসলামী স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে বড় ভোট শেয়ার পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই তারা বিদ্যমান ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ পদ্ধতির পরিবর্তে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি চালু করার পক্ষে দাবি তুলছে।
এই নির্বাচনী বাস্তবতা ইসলামী দলগুলোকে দুটো কৌশলের যেকোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য করে: হয় বড় দলের সাথে জোট, অথবা নিজস্ব একটি ভোটব্যাংক তৈরি করে কোনো নির্দিষ্ট আসনে ফোকাস করা। কিন্তু উভয় কৌশলই একতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক বিভক্তিকে উৎসাহিত করে: যদি বড় দল শুধুমাত্র একটি ইসলামী দলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তাহলে বাকি দলগুলো বিকল্প পৃষ্ঠপোষকতার সন্ধানে নিজেদের আলাদা বজায় রাখতে চায়।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ‘ধর্মীয় কার্ড’
বিএনপি ২০০১-২০০৬ সালে শাসনকালে জামায়াতের সাথে জোট গঠন করে এবং প্রথমবারের মতো জামায়াত সদস্যরা মন্ত্রিসভায় স্থান পান। আবার আওয়ামী লীগও হেফাজতের সাথে একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল। এই মেরুকরণের ফলে ছোট ইসলামী দলগুলো নিজেদের দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছে যদি বিভক্ত থাকলে অনেক ছোট দল মিলে বড় দলের সাথে আলাদা আলাদা দর-কষাকষি করতে পারে, কিন্তু একত্রিত হলে সেই সুযোগ কমে যায়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ — বাংলাদেশ কি ব্যতিক্রম?
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির বিভক্তিকে শুধু দেশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলে।
পাকিস্তানের সাথে তুলনা: পাকিস্তানেও ইসলামী রাজনীতি ভীষণভাবে বিভক্ত জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তান, জামায়াতে ইসলামী, তেহরিক-ই-ইনসাফ-এর ধর্মীয় অংশ এই বিভক্তির কারণ মূলত একই: দেওবন্দি-বেরেলভি-মওদূদী আদর্শিক বিরোধ এবং নেতৃত্বকেন্দ্রিক দলীয় সংস্কৃতি।
ইন্দোনেশিয়ার সাথে তুলনা: ইন্দোনেশিয়ায় নাহদালাতুল উলামা এবং মুহামাদিয়া এই দুটি বিশাল ইসলামী সামাজিক সংগঠন ঐতিহাসিকভাবে সুসংগঠিত থেকেছে এবং রাজনৈতিক সংগঠন থেকে আংশিকভাবে আলাদা পরিচয় বজায় রেখেছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সংবিধানের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সমঝোতা তারা করেছে, বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলো সেটি করতে পারেনি।
তুরস্কের সাথে তুলনা:তুরস্কে এরদোয়ানের একে পার্টি ইসলামী ঐতিহ্যকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একত্রিত করতে পেরেছে, কিন্তু এই সফলতার পেছনে দীর্ঘ সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রের সাথে একটি নির্দিষ্ট সম্পর্ক তৈরির প্রক্রিয়া কাজ করেছে। বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলো এখনো রাষ্ট্রের সাথে সেই সম্পর্ক সংজ্ঞায়িত করতে পারেনি।
২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশ: একতার চেষ্টা, বিভক্তির বাস্তবতা
স্বাধীনতার পর ইসলামপন্থীদের প্রথম ঐক্যের প্রচেষ্টা আসে ১৯৭৬ সালে, যখন ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত-এ-রব্বানী পার্টি এবং জামায়াত মিলে ‘ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লিগ’ গঠন করে কিন্তু এটি ১৯৭৯ সাল পর্যন্তই টিকেছিল। ১৯৮১ সালে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক নেতারা হাফেজ্জী হুজুরের নেতৃত্বে ‘উলামা ফ্রন্ট’ গঠন করেন, কিন্তু ১৯৮৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তা ভেঙে পড়ে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন: ‘জামায়াত ক্ষমতায় এলে কওমি, দেওবন্দি ও সুন্নিয়াত মাদ্রাসার অস্তিত্ব থাকবে না।এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে আদর্শিক বিভেদ আজও কতটা গভীর।
তবুও, ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ছয়টি ইসলামপন্থী দল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন ও নেজামে ইসলাম পার্টি — ঢাকায় যৌথ সমাবেশ ও মিছিল করেছে। পরবর্তীতে জামায়াত শরীয়হ আইন চাই না অভিযোগ এনে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যায়।
বিভক্তি একটি লক্ষণ, মূল ব্যাধি নয়
বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এত দল কেন — এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একটি কারণে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফলাফল:
উনিশ শতকে ফরায়েজী বনাম সুফি ধারার বিরোধ থেকে শুরু হয়ে, ঔপনিবেশিক শাসনে মুসলিম পরিচয়ের রাজনীতিকরণ, পাকিস্তান আন্দোলনে আদর্শিক বিরোধ, মুক্তিযুদ্ধে ট্রমাটিক বিভাজন, সামরিক শাসনে ধর্মীয় রাজনীতির যন্ত্রিক ব্যবহার, দেওবন্দি-মওদূদী-সুফি-সালাফি আদর্শিক বিভেদ, নেতৃত্বকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, নির্বাচনী রাজনীতির প্রণোদনা এবং বৈশ্বিক ইসলামী আন্দোলনের প্রভাব এই সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের বিভক্ত ইসলামী রাজনৈতিক মানচিত্র।
কিন্তু বিভক্তি আসলে একটি লক্ষণ। মূল ব্যাধি হলো: বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইসলাম এখনো নিজের মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি একটি বহুজাতিক, বহুভাষিক, বহুধর্মীয় আধুনিক রাষ্ট্রে ইসলামী রাজনীতির লক্ষ্য ও পদ্ধতি কী হবে?
যতদিন এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে, ততদিন বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন নতুন দল, আন্দোলন ও নেতার আবির্ভাব ঘটতেই থাকবে কারণ প্রতিটি নতুন উত্তর-প্রস্তাব একটি নতুন আন্দোলনের জন্ম দেয়। এবং এটিই বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির সবচেয়ে গভীর সত্য।
