বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এত দল কেন?

একটি প্রশ্ন, শত উত্তর। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এমন একটি দৃশ্য দেখা গেল, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকদের একইভাবে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মোট ৪৪টি সক্রিয় রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ১৩টি ইসলামপন্থী দল ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।  জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট নামের এই দীর্ঘ তালিকা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: একটিমাত্র ধর্মের নামে, মাত্র একটি দেশে, এত বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব হলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে চলবে না। এই বিভক্তির বীজ ছড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের মাটিতে, ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত এবং মুসলিম পরিচয়ের সংকটে, পাকিস্তান আন্দোলনের আদর্শিক তর্কে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিতে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী আলি রিয়াজের ভাষায়, “বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি কখনো একক বা একজাতীয় ছিল না এটি সবসময়ই বহুস্তরীয় এবং প্রতিযোগিতামূলক।এই নিবন্ধটি সেই বহুস্তরীয় ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা। ঔপনিবেশিক শাসন ও মুসলমানের পতন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার মুসলমান সমাজ এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান শাসকশ্রেণির হাত থেকে ক্ষমতা, ভূমি এবং প্রশাসনিক পদ একে একে চলে যায় হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ব্রিটিশ নিযুক্ত আমলাদের কাছে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে মডার্ন ইন্ডিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থ চ্যাটার্জি পর্যন্ত সকলেই এই পতনের ব্যাপ্তিকে স্বীকার করেছেন। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর গ্রামাঞ্চলের মুসলমান কৃষক সমাজের উপর হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ ইন্ডিগো চাষীদের শোষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পটভূমিতেই উদ্ভব হয় বাংলার প্রথম সংগঠিত ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের। ফরায়েজী আন্দোলন: ১৮১৮ সালে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। আন্দোলনটির লক্ষ্য ছিল ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব বা ফরজ পালনের উপর জোর দিয়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী চর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং অনৈসলামিক প্রথা দূর করা। মক্কায় দীর্ঘ অধ্যয়নের পর দেশে ফিরে শরীয়তউল্লাহ বাংলার মুসলমান কৃষকদের দুর্দশা এবং ধর্মীয় বিচ্যুতি দেখে মর্মাহত হন।  তাঁর সংস্কার কার্যক্রম ছিল মূলত পীর ও মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলামের বিরুদ্ধে  যা বাংলার সুফি ধারার সাথে তাঁর মৌলিক বিরোধ তৈরি করে। তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নেয় ঔপনিবেশিক করব্যবস্থা, জমিদারী শোষণ এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে জমিদারদের আঁতাতের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ হিসেবে বিকশিত হয়। ফরায়েজী আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: এটি প্রথমবারের মতো বাংলার মুসলমান সমাজকে দুটি ধারায় বিভক্ত করে একদিকে সংস্কারবাদী বা ‘শুদ্ধবাদী’ ইসলাম, অন্যদিকে সুফি ও পীরকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলাম। এই বিভাজন আজও বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্তর্গত বিরোধের একটি মূল উৎস। একই সময়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি ধারার আন্দোলন আরেকটি পৃথক ধারা তৈরি করে। ফরায়েজী ও ওয়াহাবি উভয়ই সংস্কারবাদী হলেও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য ছিল। এই প্রারম্ভিক বিভাজন পরবর্তী সকল বিভক্তির একটি আদিরূপ। পীর ও তরিকতের প্রভাব বাংলার ইসলামী রাজনীতিকে বুঝতে হলে সুফি তরিকা ও পীর-মুরিদ সম্পর্কের সামাজিক শক্তিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক অধ্যাপক আযীযুর রহমান মল্লিক তাঁর ‘British Policy and the Muslims in Bengal’গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার হয়েছিল মূলত সুফি শায়খদের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়। ফলে মুরিদদের উপর পীরের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব গ্রামীণ সমাজে এত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল যে, যেকোনো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে এই কাঠামোর সাথে লড়াই করেই এগোতে হয়েছে। পীরকেন্দ্রিক রাজনীতির এই উত্তরাধিকারই পরবর্তীকালে চরমোনাই পীর, আটরশি পীর এবং অন্যান্য দরগাহকেন্দ্রিক পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেবে। আলিগড় আন্দোলন ও বাংলার মুসলমান উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে ব্রিটিশ শাসনের সাথে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানায়। বাংলায় এর প্রভাব পড়েছিল শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের বৃহত্তর অংশ কৃষক, মাদ্রাসাশিক্ষিত আলেম, এবং পীরের মুরিদ এই সংস্কারধারার সাথে সম্পর্কিত অনুভব করেননি। ফলে শুরু থেকেই বাংলার ইসলামী আন্দোলনে একটি শ্রেণিগত ও শিক্ষাগত বিভাজন বিদ্যমান ছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম রাজনীতির উদ্ভব  ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা বাংলার মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে স্বাগত হয়েছিল, কারণ নতুন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকা হলো নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। কিন্তু মুসলিম লিগও কখনো একক ও অখণ্ড ছিল না। একদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, পাশ্চাত্যশিক্ষিত আলিগড়পন্থী নেতৃবৃন্দ, অন্যদিকে পূর্ববাংলার কৃষক সমাজ এবং দেওবন্দি আলেমদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক হাসান নূরুল এই বিভাজনকে “ইসলামী রাজনীতির দুই নদীর মোহানা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একটি ধারা ছিল আধুনিক, জাতি-রাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে, অন্যটি ছিল ধর্মীয় আইন ও খেলাফত-ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে আবদ্ধ। খেলাফত আন্দোলন ও তার পরিণতি ১৯১৯-২৪ সালের খেলাফত আন্দোলন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ এনেছিল। ইসলামী বিশ্বের খলিফার সুরক্ষার দাবিতে মুসলমান ও হিন্দু এক মঞ্চে এলেও, তুরস্কে খেলাফতের বিলোপের পর এই আন্দোলন ভেঙে পড়ে। এর পরিণতি হয় মুসলিম রাজনীতির আরও বেশি বিভক্তি কেউ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ফেরেন, কেউ কেবল ধর্মীয় পুনর্জাগরণে মনোনিবেশ করেন, আর কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে যান। জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও মওদূদীর আদর্শ ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার আট দশক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা  যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা ‘হাকিমিয়্যাহ’-র ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দি ও সুফি ধারার সাথে কখনো পুরোপুরি মেলেনি। কওমি-ভিত্তিক ইসলামপন্থী নেতারা যুক্তি দেন যে জামায়াতের ধর্মতাত্ত্বিক অভিমুখিতা তাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন মওদূদীর নবী ও সাহাবীদের বিষয়ে কিছু অভিমত তারা বিধর্মী বলে মনে করেন। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজন পরবর্তীকালে রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি করেছে। পাকিস্তান আন্দোলনে জামায়াত সমর্থন দেয়নি, কারণ মওদূদী মনে করতেন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শ পূরণ করতে পারবে না। এই অবস্থান জামায়াতকে মুসলিম লিগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের আদর্শিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।   পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতি: দ্বন্দ্বময় পরিচয় ১৯৪৭-৭১ সালের পাকিস্তান যুগে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সমাজে একটি গভীর পরিচয়সংকট দেখা দেয়। প্রশ্নটি ছিল: তারা কি প্রথমে বাঙালি, নাকি প্রথমে মুসলমান? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সংকটকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে বাঙালি মুসলমানরা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। রাজনীতিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আলী তাঁর Bengali Muslims and the Language Movement গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক দাবি ছিল না  এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির একটি নতুন সংজ্ঞার সন্ধান। এই সময় আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা ক্রমশ পাকিস্তানপন্থী অভিজাত শ্রেণির সাথে যুক্ত হয়, আর স্বতন্ত্র অর্থায়নে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বলয়