বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এত দল কেন?

একটি প্রশ্ন, শত উত্তর। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এমন একটি দৃশ্য দেখা গেল, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকদের একইভাবে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মোট ৪৪টি সক্রিয় রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ১৩টি ইসলামপন্থী দল ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।  জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট নামের এই দীর্ঘ তালিকা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: একটিমাত্র ধর্মের নামে, মাত্র একটি দেশে, এত বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব হলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে চলবে না। এই বিভক্তির বীজ ছড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের মাটিতে, ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত এবং মুসলিম পরিচয়ের সংকটে, পাকিস্তান আন্দোলনের আদর্শিক তর্কে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিতে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী আলি রিয়াজের ভাষায়, “বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি কখনো একক বা একজাতীয় ছিল না এটি সবসময়ই বহুস্তরীয় এবং প্রতিযোগিতামূলক।এই নিবন্ধটি সেই বহুস্তরীয় ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা। ঔপনিবেশিক শাসন ও মুসলমানের পতন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার মুসলমান সমাজ এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান শাসকশ্রেণির হাত থেকে ক্ষমতা, ভূমি এবং প্রশাসনিক পদ একে একে চলে যায় হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ব্রিটিশ নিযুক্ত আমলাদের কাছে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে মডার্ন ইন্ডিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থ চ্যাটার্জি পর্যন্ত সকলেই এই পতনের ব্যাপ্তিকে স্বীকার করেছেন। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর গ্রামাঞ্চলের মুসলমান কৃষক সমাজের উপর হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ ইন্ডিগো চাষীদের শোষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পটভূমিতেই উদ্ভব হয় বাংলার প্রথম সংগঠিত ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের। ফরায়েজী আন্দোলন: ১৮১৮ সালে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। আন্দোলনটির লক্ষ্য ছিল ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব বা ফরজ পালনের উপর জোর দিয়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী চর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং অনৈসলামিক প্রথা দূর করা। মক্কায় দীর্ঘ অধ্যয়নের পর দেশে ফিরে শরীয়তউল্লাহ বাংলার মুসলমান কৃষকদের দুর্দশা এবং ধর্মীয় বিচ্যুতি দেখে মর্মাহত হন।  তাঁর সংস্কার কার্যক্রম ছিল মূলত পীর ও মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলামের বিরুদ্ধে  যা বাংলার সুফি ধারার সাথে তাঁর মৌলিক বিরোধ তৈরি করে। তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নেয় ঔপনিবেশিক করব্যবস্থা, জমিদারী শোষণ এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে জমিদারদের আঁতাতের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ হিসেবে বিকশিত হয়। ফরায়েজী আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: এটি প্রথমবারের মতো বাংলার মুসলমান সমাজকে দুটি ধারায় বিভক্ত করে একদিকে সংস্কারবাদী বা ‘শুদ্ধবাদী’ ইসলাম, অন্যদিকে সুফি ও পীরকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলাম। এই বিভাজন আজও বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্তর্গত বিরোধের একটি মূল উৎস। একই সময়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি ধারার আন্দোলন আরেকটি পৃথক ধারা তৈরি করে। ফরায়েজী ও ওয়াহাবি উভয়ই সংস্কারবাদী হলেও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য ছিল। এই প্রারম্ভিক বিভাজন পরবর্তী সকল বিভক্তির একটি আদিরূপ। পীর ও তরিকতের প্রভাব বাংলার ইসলামী রাজনীতিকে বুঝতে হলে সুফি তরিকা ও পীর-মুরিদ সম্পর্কের সামাজিক শক্তিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক অধ্যাপক আযীযুর রহমান মল্লিক তাঁর ‘British Policy and the Muslims in Bengal’গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার হয়েছিল মূলত সুফি শায়খদের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়। ফলে মুরিদদের উপর পীরের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব গ্রামীণ সমাজে এত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল যে, যেকোনো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে এই কাঠামোর সাথে লড়াই করেই এগোতে হয়েছে। পীরকেন্দ্রিক রাজনীতির এই উত্তরাধিকারই পরবর্তীকালে চরমোনাই পীর, আটরশি পীর এবং অন্যান্য দরগাহকেন্দ্রিক পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেবে। আলিগড় আন্দোলন ও বাংলার মুসলমান উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে ব্রিটিশ শাসনের সাথে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানায়। বাংলায় এর প্রভাব পড়েছিল শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের বৃহত্তর অংশ কৃষক, মাদ্রাসাশিক্ষিত আলেম, এবং পীরের মুরিদ এই সংস্কারধারার সাথে সম্পর্কিত অনুভব করেননি। ফলে শুরু থেকেই বাংলার ইসলামী আন্দোলনে একটি শ্রেণিগত ও শিক্ষাগত বিভাজন বিদ্যমান ছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম রাজনীতির উদ্ভব  ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা বাংলার মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে স্বাগত হয়েছিল, কারণ নতুন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকা হলো নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। কিন্তু মুসলিম লিগও কখনো একক ও অখণ্ড ছিল না। একদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, পাশ্চাত্যশিক্ষিত আলিগড়পন্থী নেতৃবৃন্দ, অন্যদিকে পূর্ববাংলার কৃষক সমাজ এবং দেওবন্দি আলেমদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক হাসান নূরুল এই বিভাজনকে “ইসলামী রাজনীতির দুই নদীর মোহানা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একটি ধারা ছিল আধুনিক, জাতি-রাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে, অন্যটি ছিল ধর্মীয় আইন ও খেলাফত-ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে আবদ্ধ। খেলাফত আন্দোলন ও তার পরিণতি ১৯১৯-২৪ সালের খেলাফত আন্দোলন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ এনেছিল। ইসলামী বিশ্বের খলিফার সুরক্ষার দাবিতে মুসলমান ও হিন্দু এক মঞ্চে এলেও, তুরস্কে খেলাফতের বিলোপের পর এই আন্দোলন ভেঙে পড়ে। এর পরিণতি হয় মুসলিম রাজনীতির আরও বেশি বিভক্তি কেউ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ফেরেন, কেউ কেবল ধর্মীয় পুনর্জাগরণে মনোনিবেশ করেন, আর কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে যান। জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও মওদূদীর আদর্শ ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার আট দশক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা  যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা ‘হাকিমিয়্যাহ’-র ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দি ও সুফি ধারার সাথে কখনো পুরোপুরি মেলেনি। কওমি-ভিত্তিক ইসলামপন্থী নেতারা যুক্তি দেন যে জামায়াতের ধর্মতাত্ত্বিক অভিমুখিতা তাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন মওদূদীর নবী ও সাহাবীদের বিষয়ে কিছু অভিমত তারা বিধর্মী বলে মনে করেন। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজন পরবর্তীকালে রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি করেছে। পাকিস্তান আন্দোলনে জামায়াত সমর্থন দেয়নি, কারণ মওদূদী মনে করতেন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শ পূরণ করতে পারবে না। এই অবস্থান জামায়াতকে মুসলিম লিগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের আদর্শিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।   পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতি: দ্বন্দ্বময় পরিচয় ১৯৪৭-৭১ সালের পাকিস্তান যুগে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সমাজে একটি গভীর পরিচয়সংকট দেখা দেয়। প্রশ্নটি ছিল: তারা কি প্রথমে বাঙালি, নাকি প্রথমে মুসলমান? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সংকটকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে বাঙালি মুসলমানরা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। রাজনীতিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আলী তাঁর Bengali Muslims and the Language Movement গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক দাবি ছিল না  এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির একটি নতুন সংজ্ঞার সন্ধান। এই সময় আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা ক্রমশ পাকিস্তানপন্থী অভিজাত শ্রেণির সাথে যুক্ত হয়, আর স্বতন্ত্র অর্থায়নে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বলয়

প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী: রাষ্ট্রের না দলের ?

একটি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাই। কিন্তু যখন প্রশাসনিক কাঠামো দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। আর সেই দুর্বলতার পরিণতিতে গণতন্ত্র কেবল সংকটাপন্নই হয় না, অনেক সময় তার অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দল তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্র কখনোই পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে এখানে গণতন্ত্রের আবরণে বিভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ও বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সেনা অভ্যুত্থান, দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশাবাদ তৈরি করলেও, ১৯৯১ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই প্রত্যাশাকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মাগুরার উপনির্বাচন, ১৯৯৬ সালের একক নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্রমাগত দুর্বল করে তোলে। তবে ২০০৮ সালের পর পরিস্থিতি আরও গভীর সংকটে রূপ নেয়, যখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তারা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অধীন, তবুও তাদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট আইন ও আচরণবিধি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়শই সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় আনুগত্য, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি ও প্রভাব অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ ধারণের বিষয়টি বক্তৃতায় তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। অথচ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি-২৫ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে এই ধরনের ঘটনা শুধু আচরণবিধির লঙ্ঘনই নয়, বরং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার জন্যও বড় হুমকি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে দলীয়করণ ও আজ্ঞাবহ প্রশাসন একটি রাষ্ট্রকে কতটা বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে এবং নাগরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির পথে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি এমপি ও মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে পদোন্নতির জন্য ডিও লেটার প্রদানও এখন প্রকাশ্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার বিধি-২০ এবং বিধি-৩০ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক বা বাহ্যিক প্রভাব ব্যবহার করতে পারেন না। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এ অসদাচরণের জন্য তিরস্কার, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ না থাকায় এসব বিধান অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো ব্যবস্থা নয়; এটি মূলত প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির ভিত্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশাসন রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সংবিধান, আইন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। অন্যথায় প্রশাসনের মেধা ও পেশাদারিত্ব রাজনৈতিক তোষণ ও দলীয় স্বার্থের কাছে বারবার পরাজিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল ও অকার্যকর করে তুলতে পারে।

শেরে বাংলা ফজলুল হক বুঝেছিলেন পাকিস্তান টিকবে না

কলকাতার বাবুরা বলেছেন, “ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “ এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক । শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । ১৯১৮ -১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব । ১৯৩৭ এর নির্বাচনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে জিতলে তিনি জমিদারি প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করবেন। তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন তার জন্য সারা বাংলাদেশ আর কলকাতার জমিদাররা একত্র হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। লাভ হয়নি — কৃষকরা তাদের নেতাকে ভোট দিয়েছেন। মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব । ১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পাঞ্জাবের মওলানা জাফর আলী খান, সীমান্ত প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধের স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী ঈসা ফজলুল হকের প্রস্তাব সমর্থন করেন। কনফারেন্সে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকার কারণে ফজলুল হক খুবই উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা উত্তেজিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে একবার বলেন, ‘ আমি আগে মুসলিম, পরে বাঙালী (muslim first, bengali afterwards)’। বক্তৃতার এক পর্যায়ে এসে বলেন, ‘কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে যদি আর কোনো মুসলিম নির্যাতিত হয় তাহলে আমি বাংলার হিন্দুদের উপর তার প্রতিশোধ নেব।’ যে ফজলুল হক তিন বছর আগে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমউদ্দিনকে রেখে শ্যামাপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছেন সেই ফজলুল হকের মুখে এমন বক্তব্য তখনকার ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃাষ্ট করেছিল। বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি টাইপ করার সময়ে ভুল করে muslim majority states লেখা হয়েছে; আসলে হবে state । জিন্নাহর ধারণা ছিল, দেন-দরবার করে দুই পাশে দুইটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই স্টেটস এর জায়গায় স্টেট লিখে একটা মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্র করতে হবে। জিন্নাহর এই ধূর্ততার কারণে ফজলুল হক তার সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হননি। তরুণ শেখ মুজিব যখন জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তখন অভিজ্ঞ ফজলুল হক পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। ‘তিঁনি অনুমান করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কী কী দুর্দশা হবে বাংলার মানুষের। তাই তিঁনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন……. “বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চাননা এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়েই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন- দাঁড়িয়ে বললেন,”যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।” এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।” বঙ্গবন্ধু ‘ র বাবা বলেছেন , ” বাবা তুমি যাই করো শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলো না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হয়নি। “ ফজলুল হক জানতেন মাঝখানে ভারতকে রেখে পশ্চিম আর পূর্বে জোড়া দিয়ে এক পাকিস্তান করলে তা কখনো টিকবে না। ‘ জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে ফেলেছে -বলে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেননি। ১৯৪৬ এ এসে জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর দুই বাংলা একত্র করে স্বাধীন যুক্তবাংলার দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাও ভাগ করতে হল। ফজলুল হক বলেছিলেন, একটি পাকিস্তান কখনও টিকবে না। বাংলা এবং আসামকে নিয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে। ১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, ফজলুল হকের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতবাণী সঠিক। ১৯৭১ এর মত এমন কিছু যে ঘটবে শেরে বাংলা ফজলুল হক তা আঁচ করতে পেরেছিলেন ১৯৪০ সালেই। তাই তিনি ১৯৪০ সালেই বাংলা আর আসাম নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯৭১ এর যুদ্ধ হল ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব ফজলুল হক যেভাবে উত্থাপন করে ছিলেন সেভাবে মানলে একাত্তরে এই দেশে রক্তগঙ্গা বইত না। পেশাজীবনে ‘কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী ছিলেন। একদিন তাঁর জুনিয়র হাতে একগাদা পত্রিকা নিয়ে এসে বললেন, ” স্যার , দেখুন , কলকাতার পত্রিকাগুলো পাতার পর পাতা লিখে আপনার দুর্নাম ছড়িয়ে যাচ্ছে — আপনি কিছু বলছেন না । ” তিঁনি বললেন, ” ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখছে তার মানে হল আমি আসলেই পুর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকদের জন্য কিছু করছি। যেদিন ওরা আমার প্রশংসা করবে সেদিন মনে করবে বাংলার কৃষক বিপদে আছে। “ মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বরিশাল বারের নামকরা উকিল । একবার ওয়াজেদ আলী র প্রতিপক্ষ মামলার ইস্যু জটিল হওয়ার কারণে কলকাতা থেকে তরুণ উকিল ফজলুল হককে নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীকে মোকাবেলা করার জন্য । ফজলুল হক ওই সময়ে কেবলমাত্র ফজলুল হক , শেরে বাংলা তখনও হননি । তিনি মামলা লড়তে এসেছেন , কিন্তু বিপক্ষের উকিল কে সেই খবর জানতেন না ।