“ইতিহাস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, ইতিহাস হলো যোগ্য মানুষের যোগ্যতম কর্মের সমষ্টি।”
১৯৬৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি। রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার গগনবিদারী স্লোগান। মাত্র ছাব্বিশ বছরের এক টগবগে তরুণ ছাত্রনেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে ডালিম কুমারী কণ্ঠে ঘোষণা করলেন এক যুগান্তকারী উপাধি – “বঙ্গবন্ধু”।
সেই তরুণ আর কেউ নন, তিনি তোফায়েল আহমেদ। শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা সেই কণ্ঠটি আজ আজীবনের জন্য স্তব্ধ। ২০২৬ সালের ১লা জুন, ৮২ বছর বয়সে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম প্রধান এই রূপকার। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটল ওয়ান-ম্যান আর্মির মতো দীর্ঘ পাঁচ দশকের এক দাপুটে রাজনৈতিক মহাকাব্যের।
১৯৪৩ সালের ২২শে অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের এই মেধাবী ছাত্র ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন ডাকসুর ভিপি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নায়ক হিসেবে তিনি আইয়ুব খানের তখত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৭১ সালে যখন দেশ স্বাধীন করার চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলো, তখন তোফায়েল আহমেদ আবির্ভূত হলেন যুদ্ধের অগ্রবর্তী সেনানি হিসেবে।
বিখ্যাত রোমান কবি ওভিডের সেই উক্তিটি তাঁর সাথে মিলে যায়—
“The mind, not the body, makes the champion.” তিনি কেবল মগজে নয়, শক্তিতেও ছিলেন চ্যাম্পিয়ন।
মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ‘মুজিববাহিনী’র পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান হিসেবে বরিশাল, খুলনা, ফরিদপুরসহ বিশাল অঞ্চলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালে মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথমবার নৌকা প্রতীক নিয়ে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য হওয়া এই তরুণ পরে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিতেও স্বাক্ষর করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে পঁচাত্তরের পূর্ব পর্যন্ত তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিন্তু পঁচাত্তরের ট্র্যাজেডির পর তাঁর জীবন বদলে যায়। টানা ৩৩ মাস কারাবরণ এবং নির্মম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে তিনি শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
তবে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—
“রাজনীতিতে কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই।”
২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত সরকারের আমলে দলের ভেতরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পক্ষে মত দেওয়ায়, পরবর্তীতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সতীর্থ শেখ হাসিনার সাথে তাঁর এক অদৃশ্য দূরত্বের সৃষ্টি হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে নৌকা প্রতীক নিয়ে ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এমপি থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ এক দশকেরও বেশি সময় তিনি দলের রাজনীতিতে এক প্রকার কোণঠাসা ও অবহেলিত ছিলেন। ক্ষমতার চূড়া দেখা এই মানুষটি শেষ জীবনে এসে তীব্র এক হতাশা ও একাকীত্বে ভুগেছেন, যদিও মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি মুজিবের আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি।
রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রের মাঝে তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক জীবনটি ছিল শান্ত এক দ্বীপের মতো। ১৯৬৪ সালে তিনি দনিয়ার আলহাজ্ব মফিজুল হক তালুকদারের জ্যেষ্ঠ কন্যা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ ছয় দশকের সুখের দাম্পত্য জীবনের পর, ২০২৫ সালে আনোয়ারা বেগম পরলোকগমন করেন, যা তোফায়েল আহমেদকে মানসিকভাবে বেশ ভেঙে ফেলেছিল। এই দম্পতির একমাত্র কন্যাসন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় একজন চিকিৎসক। তাঁর জামাতা তৌহিদুজ্জামান তুহিনও স্কয়ার হাসপাতালের একজন খ্যাতনামা কার্ডিওলজিস্ট।
তবে তোফায়েল আহমেদের পারিবারিক জীবনের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়টি জড়িয়ে আছে তাঁর দত্তক নেওয়া পুত্র মাইনুল হোসেন বিপ্লবের সাথে। বড় ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর ছোট ছেলে বিপ্লবকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি স্নেহে আগলে রেখেছিলেন তিনি, সবখানে পরিচয় করিয়ে দিতেন নিজের পুত্র হিসেবেই। রাজনীতিহীন বড় ভাইয়ের আকস্মিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পেছনে তোফায়েল আহমেদ সবসময় নিজের রাজনৈতিক ব্যস্ততা ও অংশগ্রহণকে দায়ী করে এক তীব্র অপরাধবোধে (Guilt) ভুগতেন। আর সেই অনুশোচনা থেকেই ভাইয়ের সন্তানকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসা দিয়েছিলেন তিনি।
চাঁদেরও যেমন কলঙ্ক থাকে, তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেও কিছু অন্ধকার অধ্যায় ছায়া ফেলেছিল। ১৯৬৯ সালের আগস্টে শিক্ষা কমিশন নিয়ে আলোচনার সূত্র ধরে ইসলামী ছাত্রনেতা আব্দুল মালেকের ওপর তাঁর নেতৃত্বে হওয়া হামলার ঘটনাটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে, যার ফলশ্রুতিতে আব্দুল মালেক মারা যান।
রাজনীতির পটপরিবর্তনের পর জীবনের শেষপ্রান্তে এসে এই বর্ষীয়ান নেতাকে আইনি লড়াইয়ের মুখোমুখিও হতে হয়। ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৬ সালের মে মাসেই অভিযোগ গঠন করে আদালত। জীবনের শেষ দিনগুলোতে যখন শরীর বার্ধক্যজনিত নানাবিধ রোগে জীর্ণ, তখন আদালতের কাঠগড়া আর আইনি নোটিশ তাঁর ট্র্যাজেডিকে আরও ঘনীভূত করেছিল।
আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্টের সেই বিখ্যাত লাইনটি মনে পড়ে—
“The woods are lovely, dark and deep, but I have promises to keep…”
তোফায়েল আহমেদেরও কিছু অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি বা শেষ ইচ্ছা ছিল—ভোলা-বরিশাল সেতু নির্মাণ, ভোলায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম গড়ে তোলা।
২০২৬ সালের ১লা জুন সব ইচ্ছার অবসান ঘটিয়ে তিনি পাড়ি জমালেন না-ফেরার দেশে। তিনি এমন এক রাজনৈতিক প্রজন্মের প্রতিনিধি ছিলেন, যারা ইতিহাস পড়ার থেকে, ইতিহাস তৈরি করেছেন বেশি।
