ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ২০০৬ সালের ৯ জুলাইয়ের রাতটি যেন এক দ্বান্দ্বিক স্মৃতি। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে জিনেদিন জিদানের বিদায়লগ্নের সেই বিখ্যাত ‘হেডবাট’ ও ইতালির বিশ্বকাপ জয়—ফুটবল প্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয়। কিন্তু সেই জয়ের উল্লাসের আড়ালে যে ইতালীয় ফুটবলের জন্য দীর্ঘ এক ‘অভিশাপ’ লুকিয়ে ছিল, তা যেন আজ দুই দশক পরে এসে আরও স্পষ্ট। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি সেই গৌরবের শিরোপা জয়ের পর থেকেই বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের ছন্দ হারিয়েছে। টানা ১২ বছর বিশ্বকাপের মূল পর্বে ইতালিবিহীন থাকা আজ্জুরিদের এই বর্তমান দুর্দশা কেবল মাঠের পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি ফুটবল ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি।
২০০৬ সালের সেই শ্রেষ্ঠত্বের পর থেকেই ইতালির পারফরম্যান্সে এক ভয়াবহ ধস নেমেছে। ২০১০ এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে না পারা ছিল কেবল প্রারম্ভিক ব্যর্থতা। এর পরের চিত্রটি ছিল আরও করুণ; ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইতালি বাছাইপর্বের গণ্ডি পেরোতেই ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে সুইডেন এবং নর্থ মেসিডোনিয়ার মতো দলের কাছে হেরে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়া চারবারের চ্যাম্পিয়নদের জন্য ছিল এক বিশাল অপমান। ফুটবল বোদ্ধারা একে ‘নতুন প্রজন্মের অভাব’ বা ‘সিরি আ-র কাঠামোগত দুর্বলতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, ইতালীয় সমর্থকদের একাংশ একে দেখছে এক অলৌকিক নিয়তির লিখন হিসেবে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, জিদানকে মাঠ থেকে বিদায় করার সেই বিতর্কিত ফাইনাল জয়ের পর থেকেই ইতালীয় ফুটবলের ওপর যেন এক ধরনের অশুভ ছায়া ভর করেছে।
ইতালির এই দীর্ঘ পতনের পেছনে অবশ্য গভীর কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে। ইতালীয় তরুণ প্রতিভার লালনের অভাব, রক্ষণাত্মক ফুটবল থেকে আধুনিক গতিময় আক্রমণে রূপান্তরের ধীরগতি এবং বড় টুর্নামেন্টের চরম স্নায়ুচাপ সামলাতে বর্তমান দলের অক্ষমতা আজ্জুরিদের পতনের মূল কারণ। একসময় যারা ছিল বিশ্ব ফুটবলের রক্ষণভাগের অজেয় দুর্গ, তারা এখন নিজেদের ঘরেই পথ হারিয়েছে। সিরি আ-তে বিদেশি খেলোয়াড়দের আধিপত্য ও স্থানীয় ফুটবলারদের সীমিত সুযোগ তাদের জাতীয় দলের গভীরতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জিদানের সেই বিদায়লগ্নে পাওয়া জয়টি হয়তো ছিল ভাগ্যের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি, কিন্তু তার পরবর্তী দুই দশকের পারফরম্যান্স বলে দেয়, ইতালি তাদের ঐতিহ্যগত শৃঙ্খলা ও ফুটবলীয় দর্শনকে অনেকটাই বিসর্জন দিয়েছে।
ইতালির ফুটবল ইতিহাসে বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর নজির থাকলেও, বর্তমান সময়ে বিশ্বফুটবলে ইতালি যেন এক হারিয়ে যাওয়া শক্তি। বিশ্বকাপের মাঠে ইতালির রক্ষণভাগের শৈল্পিক লড়াই ও লড়াকু মানসিকতা দর্শক আজ তীব্রভাবে অনুভব করছে। বার্লিনের সেই গৌরবময় স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ইতালি কি পারবে নতুন কোনো রূপকল্প তৈরি করতে? নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা কি সেই পুরনো ‘অভিশাপ’ ভেঙে আজ্জুরিদের নতুন কোনো ভোরের স্বপ্ন দেখাতে পারবে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় আছে বিশ্বজুড়ে থাকা অগণিত ফুটবল প্রেমী। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বিশ্বমঞ্চে ইতালির মতো ঐতিহ্যবাহী দলের অনুপস্থিতি সবসময়ই ফুটবলের জৌলুসকে খানিকটা হলেও ফিকে করে দেয়। ইতালির জন্য এখন সময় এসেছে রূপকথার গল্প ছেড়ে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করার।
