প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী: রাষ্ট্রের না দলের ? -
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী: রাষ্ট্রের না দলের ?

By

Picture of Araf Bhuyan

Araf Bhuyan

Share

Facebook
X
LinkedIn

একটি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাই। কিন্তু যখন প্রশাসনিক কাঠামো দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। আর সেই দুর্বলতার পরিণতিতে গণতন্ত্র কেবল সংকটাপন্নই হয় না, অনেক সময় তার অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দল তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্র কখনোই পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে এখানে গণতন্ত্রের আবরণে বিভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে।

স্বাধীনতার পরপরই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ও বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সেনা অভ্যুত্থান, দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশাবাদ তৈরি করলেও, ১৯৯১ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই প্রত্যাশাকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মাগুরার উপনির্বাচন, ১৯৯৬ সালের একক নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্রমাগত দুর্বল করে তোলে। তবে ২০০৮ সালের পর পরিস্থিতি আরও গভীর সংকটে রূপ নেয়, যখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।

এই বাস্তবতায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তারা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অধীন, তবুও তাদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট আইন ও আচরণবিধি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়শই সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় আনুগত্য, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি ও প্রভাব অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ ধারণের বিষয়টি বক্তৃতায় তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। অথচ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি-২৫ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে এই ধরনের ঘটনা শুধু আচরণবিধির লঙ্ঘনই নয়, বরং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার জন্যও বড় হুমকি।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে দলীয়করণ ও আজ্ঞাবহ প্রশাসন একটি রাষ্ট্রকে কতটা বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে এবং নাগরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির পথে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি এমপি ও মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে পদোন্নতির জন্য ডিও লেটার প্রদানও এখন প্রকাশ্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।

সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার বিধি-২০ এবং বিধি-৩০ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক বা বাহ্যিক প্রভাব ব্যবহার করতে পারেন না। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এ অসদাচরণের জন্য তিরস্কার, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ না থাকায় এসব বিধান অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো ব্যবস্থা নয়; এটি মূলত প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির ভিত্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশাসন রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সংবিধান, আইন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। অন্যথায় প্রশাসনের মেধা ও পেশাদারিত্ব রাজনৈতিক তোষণ ও দলীয় স্বার্থের কাছে বারবার পরাজিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল ও অকার্যকর করে তুলতে পারে।

Author

Popular News