‘রইদ’ কেন সর্বসাধারণের সিনেমা হলো না

‘রইদ’ মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় সিনেমা। রইদ-এ সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। রইদ সিনেমায় নাজিফা তুষির নিজস্ব কোনো নাম ছিলো না। পুরো সিনেমায় ‘সাধুর বউ’ হিসাবে অভিনয় করেছেন এবং সিনেমা মুক্তির পরও এই নামে পরিচিতি পেয়েছেন দর্শকদের কাছে। তবে রইদ বাংলাদেশের প্রচলিত সিনেমা থেকে অনেকটা ভিন্নধর্মী। বাংলাদেশে এই ধারার সিনেমা খুব কমই তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্লেষক, সমালোচক ও দর্শকরা নানামুখি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ রইদ কে আর্টফিল্ম বলেও সম্মোধন করছেন।

আর্ট মূলত কী? এই প্রশ্নের উত্তর যুগে যুগে অনেকে অনেক ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর্টের নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই, মানুষ নিজেরাই মূলত আর্টের অর্থ বের করে নেয় তার রস, গল্প থেকে। রইদের নির্মাতা বলতেছেন রইদ-এর আলাদা অর্থ আছে, স্বতন্ত্র গল্প আছে যা দর্শকদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে আর্টফিল্মের ব্যাপারে চলচ্চিত্র সমালোচক ও শিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা ধারণা পাওয়া যায়। মার্কিন লেখক ও চলচ্চিত্র সমালোচক জোনাথন রোজেনবাউমের মতে, “সিনেমা জগতের সঙ্গেই সম্পর্কিত, এটির বিকল্প নয়। আর আর্ট ফিল্ম বাস্তববিমুখ বিনোদন না দিয়ে দর্শকের চেনা জগৎকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করে।”

পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক ও চিত্রনাট্য লেখক রজার এবার্টের দৃষ্টিতে, “আমি যদি আর্ট ফিল্মকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই, তবে তা হবে আচরণের ক্লোজ অবজারভেশনের ওপর তৈরি সিনেমা। যেখানে বুদ্ধিমত্তা ও সহমর্মিতার প্রয়োজন হয়।”

রইদ দেখার পর অনেক দর্শক রইদের গল্পকে অনেক জটিল ছিলো বলে মন্তব্য করেছেন। দর্শকের মতে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রতিকী, মেটাফোর ব্যবহার করেছেন। যা দর্শকের কাছে অস্পষ্টতা তৈরি করেছে। যার ফলে মূল গল্প থেকে সাধারণ দর্শক কিছুটা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেছেন। রইদ-এ প্রধান চরিত্রে অভিনীত মোস্তাফিজুর নূর ইমরান দর্শকের একাংশের সিনেমাটি বুঝতে না পারার পেছনে সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘‌আসলে সবকিছু বুঝে ওঠার মতো মনন এখনো আমাদের দর্শকের তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ৩০-৩২ বছর ধরে লোকচর্চার যে অভাব, তাতে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনেক কিছুই তো নষ্ট হয়ে গেছে। তবে রইদের মধ্য দিয়ে একটা নতুন ট্রেন্ড সেট হলো, যা আগামীতে অন্যরা অনুসরণ করবে।’

রইদ-এর গল্প পরিচালক মেজবাউর সুমন তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলে গেছেন। কিছু ক্ষেত্রে গল্পের সরাসরি উত্তর না দিয়ে দর্শকদের ব্যাখ্যার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। গল্পের মধ্যে ‘একশন, আইটেম গান, ফাইটিং, আবেগের আতিশয্য নেই। যা মূলত এই অঞ্চলের মানুষ সিনেমাতে দেখে অভ্যস্ত। মূলত বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে এইসব উপাদানগুলো দেখা যায়। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আয়কারী দশটি সিনেমার মধ্যে প্রথম পাঁচটি সিনেমা- বরবাদ, তুফান, প্রিয়তমা, তান্ডব, রাজকুমার। এই সবগুলোতেই ‘একশন, ফাইটিং, স্টারডম, গ্লামার, রোমান্স, আইটেম গান, আবেগের রেষ, উপাদানগুলো বিদ্যমান। সেক্ষেত্রে রইদ যে ভিন্ন ধারার সিনেমা এবং সেটা যে বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সেটাকে বিভিন্ন মহল সাধুবাদ জানাচ্ছে।

রইদ দেখে অনেক সাধারণ দর্শক গল্প না বুঝার পিছনের কারণগুলো হতে পারে, মিকেল এঞ্জেলোর পেইন্টিং, ক্রিয়েশন অফ এডাম, ইভ আর লিলিথ, ইডেন গার্ডেন, বুদ্ধ ধর্মের শামশারা, এস এম সুলতানের ছবির গ্রাম, নোয়াস আর্ক এসব সম্পর্কে সবার সমান জানাশোনা না থাকা। তবে রইদ সিনেমার সাউন্ড কোয়ালিটির মান, সিনেমেটোগ্রাফির শর্ট, ভিজ্যুয়াল এফেক্ট অনেকটা দারুণ ছিলো বলে প্রায় সকল দর্শক মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে রইদ-এর গল্প মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন গল্পগুলোকে নানান স্তরে দেখানের চেষ্টা করেছে। সেগুলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তুলে আনার চেষ্টা করেছে। যেমন- ‘গন্ধম’ ফলের বিকল্প তালকে সামনে এনেছেন। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন। তবে এখানে উল্লেখ্য একটা বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ সিনেমায় গল্পের উপসংহার থাকে কিন্তু রইদের নেই। রইদ উল্টো উত্তর না দিয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন তৈরি করে। সেইসব প্রশ্নের উত্তর নেই, দর্শক নিজের মতো করে উত্তর খুঁজে নেওয়ার উপর ছেড়ে দিয়েছে। পাশাপাশি রইদ অনেক জায়গায় বিবলিক্যাল মেটাফোর ব্যবহার করেছে। গল্পের প্রয়োজনেই সেসব মেটাফোর ব্যবহার করেছে। তবে মেটাফোরগুলো ধরতে পারলে দর্শকদের জন্য সরল গল্পটা অনেক উপভোগ্য হতে পারে। সব বিবেচনা করে রইদ ভিন্নধর্মী সিনেমা হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত সিনেপ্লেক্সে, হলগুলোতে সমানতালে প্রাসঙ্গিক হওয়া প্রমাণ করে রইদ-এর আলো ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে ঠিকই পৌঁছাচ্ছে।

Author

Trending

Popular