ব্যাংকিং খাতে একটি পুরোনো সত্য আছে। ব্যাংক ভাঙে টাকা শেষ হয়ে গেলে নয়, ভাঙে যখন মানুষের বিশ্বাস শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে গত পাঁচ কর্মদিবসে ৩,৫০০ কোটিরও বেশি টাকা উত্তোলনের ঘটনা সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনে দিয়েছে। ঘটনাটি কেবল একটি ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পরিসংখ্যান নয়; এটি আমানতকারীদের আস্থা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের একটি বড় সংকেত।
নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পরপরই ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ, কর্মসূচি এবং পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চেয়ারম্যানের প্রথম কার্যদিবসের বোর্ড সভা সরাসরি নয়, অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়।
এরপরই শুরু হয় আরেক ধরনের ভোট ,নীরব ভোট। এই ভোট ব্যালট বাক্সে নয়, ব্যাংকের কাউন্টারে দেওয়া হয়।গ্রাহকরা প্রতিবাদ মিছিলে না গিয়েও নিজেদের অবস্থান জানাতে শুরু করেন টাকা তুলে নেওয়ার মাধ্যমে। মাত্র চার কর্মদিবসে প্রায় ২,৫৭০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী একদিনে আরও প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা উত্তোলিত হয়। মোট পরিমাণ ৩,৫০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে।
ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন, একজন আমানতকারী যখন টাকা জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু টাকা নয়, বিশ্বাসও জমা রাখেন। আর যখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তখন মানুষ প্রথমেই নিজের সঞ্চয় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে চায়।ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহেও সেই মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেউই এখনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে। অর্থাৎ সংকটটি আপাতত অর্থের ঘাটতির নয়, বরং আস্থার ঘাটতির।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যাংকটি গত এক বছরে আমানত বৃদ্ধির দিক থেকে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটিরও বেশি নতুন আমানত যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ যে ব্যাংকে মানুষ নতুন করে টাকা রাখতে শুরু করেছিল, সেই ব্যাংক থেকেই এখন মানুষ দ্রুত টাকা সরিয়ে নিচ্ছে।
এ কারণেই ৩,৫০০ কোটি টাকার এই উত্তোলনকে শুধু আর্থিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি “Confidence Test”। মানুষ কি ব্যাংকের নেতৃত্বে আস্থা রাখছে? মানুষ কি মনে করছে তাদের সঞ্চয় নিরাপদ? মানুষ কি বিশ্বাস করছে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন নির্ধারণ করবে ইসলামী ব্যাংকের পরবর্তী পথচলা।
ইতিহাস বলে, ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনের শুরু হয় সাধারণত গুজব থেকে; কিন্তু সেই গুজব যদি আস্থার সংকটের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে সেটি দ্রুত ব্যাংক রান (Bank Run)-এর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই পর্যায়ে বলতে নারাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, তবুও কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন বাজারে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই…
ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি তারল্য সংকট, নাকি বিশ্বাস পুনর্গঠন?
কারণ ব্যাংকিং জগতে টাকা হারালে তা ফেরত আনা যায়; কিন্তু বিশ্বাস হারালে সেটি ফিরিয়ে আনতে কখনো কখনো বছরের পর বছর লেগে যায়।

