অন্ধকার অর্থের আলোয় ফেরা

“এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি,

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী এই পঙ্‌ক্তিমালা যেন আধুনিক বিশ্ব-অর্থনীতির এক নিদারুণ এবং রূঢ় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানুষের এই অন্তহীন লোভ আর অবৈধভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করার আদিম প্রবৃত্তি থেকেই মূলত জন্ম নেয় ‘ছায়া অর্থনীতি’ বা ‘কালো টাকা’। যখন রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে অগোচরে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে এবং সেই অন্ধকার অর্থ রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করতে উদ্যত হয়, তখন সেই অর্থকে মূলধারার আলোয় ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রকেই কখনো কখনো আপসের পথে হাঁটতে হয়। অনৈতিক হলেও বাস্তবতার নিরিখে করা এই কাঠামোগত আপসেরই আনুষ্ঠানিক নাম হলো ‘কালো টাকা সাদা করার নীতি’ বা ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’, যা যুগ যুগ ধরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়।

কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি বিশ্ব অর্থনীতিতে সাধারণত ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’ (Tax Amnesty) বা ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার প্রোগ্রাম’ (VDP) নামে পরিচিত। এটি মূলত সরকারের এমন একটি নীতি, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবৈধ উৎস থেকে বা অপ্রদর্শিতভাবে অর্জিত অর্থ নির্দিষ্ট কর ও জরিমানাসাপেক্ষে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রকাশনা অনুযায়ী, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা, কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা এবং ছায়া অর্থনীতিকে (Shadow Economy) আনুষ্ঠানিক বা মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা।

আধুনিক কর ব্যবস্থায় এই ধারণার প্রয়োগ শুরু হয় মূলত বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কর প্রশাসন (IRS) প্রথম স্বেচ্ছা ঘোষণার সুযোগ দিয়ে করদাতাদের অপরাধমূলক মামলা থেকে মুক্তির নীতি গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৫১ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫, ১৯৯৭ সালের ‘ভিডিস’ (VDIS) ও ২০১৬ সালে বিভিন্ন পর্যায়ে অপ্রদর্শিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ইউরোপের দেশ ইতালিতেও ২০০১ সালে “স্কুডো ফিসক্যালে” (Scudo Fiscale) নামে একটি বড় ট্যাক্স অ্যামনেস্টি চালু হয়, যার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

কালো টাকা সাদা করার এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে করদাতা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দেশের ভেতরে বা বিদেশে থাকা তার অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদের পরিমাণ স্বেচ্ছা ঘোষণা (Voluntary Declaration) করেন। এরপর কর কর্তৃপক্ষ সেই ঘোষিত সম্পদের বাজারমূল্য যাচাই করে তার ওপর প্রযোজ্য কর ও জরিমানার হার নির্ধারণ করে। পরবর্তী ধাপে করদাতা নির্ধারিত সেই অর্থ পরিশোধ করেন, যেখানে সাধারণত জরিমানা স্বাভাবিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তুলনায় কিছুটা কম রাখা হয় যাতে মানুষ এই সুযোগ নিতে উৎসাহিত হয়। সবশেষে, সকল শর্ত পূরণের পর করদাতাকে পূর্বের কর ফাঁকির জন্য ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা থেকে আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি (Legal Immunity) দেওয়া হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নীতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছে। ওইসিডি (OECD)-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায় একটি বিশাল ট্যাক্স অ্যামনেস্টি প্রোগ্রাম চালু করা হয়, যেখানে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ঘোষণা করা হয় এবং সরকার প্রায় ৯.৬ বিলিয়ন ডলার কর আদায় করতে সক্ষম হয়, যা বিশ্বের অন্যতম সফল একটি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। একই বছর আর্জেন্টিনায় ‘সিনসেরামিয়েন্তো ফিসক্যাল’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলারের অঘোষিত সম্পদ মূলধারায় আসে। অন্যদিকে, ভারতের ২০১৬ সালের ইনকাম ডিক্লারেশন স্কিমে (IDS) প্রায় ৬৫,২৫০ কোটি রুপি অঘোষিত সম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয়। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রও ২০০৯ সাল থেকে অফশোর ভলান্টারি ডিসক্লোজার প্রোগ্রামের (OVDP) মাধ্যমে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি অ্যাকাউন্টে লুকানো অর্থ মূলধারায় আনতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।

অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে কর সাধারণ ক্ষমার প্রভাব দ্বিমুখী। স্বল্পমেয়াদে এটি হঠাৎ করে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়, যা বিশেষ করে অর্থনৈতিক মন্দা বা বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় সাময়িক স্বস্তি দেয় এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে একে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ (Moral Hazard) বা নৈতিক স্খলনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতিবিদ জেমস আল্ম (James Alm) এবং ডব্লিউ. বেক-এর ১৯৯০ সালের বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, ঘন ঘন ট্যাক্স অ্যামনেস্টি দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের কর দেওয়ার প্রবণতা (Tax compliance) কমে যায়। নিয়মিত ও সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন, কারণ তারা দেখতে পান যে কর ফাঁকি দিয়ে পরবর্তীতে সামান্য জরিমানা দিয়েই পার পাওয়া সম্ভব।

কালো টাকা সাদা করার নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি সাময়িক দাওয়াই বা ‘কুইক ফিক্স’ হিসেবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কর শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কারণে আধুনিক বিশ্বে ওইসিডি (OECD) এবং জি-২০ ভুক্ত উন্নত দেশগুলো এখন এই ধরনের কর ক্ষমার বদলে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অফ ইনফরমেশন (AEOI), আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং তথ্য বিনিময় এবং উন্নত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধের ওপরই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করছে।

Author

Trending

Popular