বাংলাদেশের ইতিহাসে শতাধিক নারী আসামি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছে। তাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে কনডেম সেলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন, প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা রাষ্ট্রপতির ক্ষমার রায়ের জন্য। কিন্তু বিস্ময়কর একটি বাস্তবতা হলো ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি। অথচ একই সময়ে শত শত পুরুষ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সাজা কার্যকর হয়েছে।
এই দীর্ঘ ৫৫ বছরের ব্যতিক্রমী ধারার পেছনে কি আইনি কোনো বাধা রয়েছে, নাকি বিচারব্যবস্থার অন্য কোনো বাস্তবতা কাজ করছে?
আইনি মিথ বনাম বাস্তবতা
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে বাংলাদেশের আইন হয়তো নারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি দেয় না। বাস্তবে ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় নারী ও পুরুষের জন্য শাস্তির বিধান সমান। হত্যা, যুদ্ধাপরাধ, সন্ত্রাসবাদ বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধে আদালত প্রয়োজন মনে করলে নারী আসামিকেও মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে। বাস্তবেও বিভিন্ন সময়ে বহু নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে রায় ঘোষণার পর শুরু হয় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া, আর সেখানেই বদলে যায় অধিকাংশ মামলার পরিণতি।
মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন: উচ্চ আদালতের ভূমিকা
বাংলাদেশে কোনো নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইকোর্টে অনুমোদনের জন্য যায়। এরপর আপিল বিভাগে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ থাকে। এই দীর্ঘ বিচারিক পর্যালোচনায় বহু নারী আসামির মৃত্যুদণ্ড কমে যায় যাবজ্জীবন বা আমৃত্যু কারাদণ্ডে।
সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো ঐশী রহমান। ২০১৫ সালে নিজের বাবা-মাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হলেও পরবর্তীতে হাইকোর্ট তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপান্তর করে। আদালত রায়ে তার বয়স, মানসিক অবস্থা, অপরাধ সংঘটনের প্রেক্ষাপট এবং আত্মসমর্পণের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়। একইভাবে শরিফা বেগম প্রায় ২৪ বছর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অবস্থায় কারাগারে থাকার পর ২০২৪ সালে আপিল বিভাগে তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়।
আইনজীবীদের মতে, নারী আসামিদের ক্ষেত্রে আদালত প্রায়ই সামাজিক, পারিবারিক ও মানবিক প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যা অনেক সময় চূড়ান্ত শাস্তি পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।
বছরের পর বছর ঝুলে থাকা আপিল
বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে একাধিক স্তরের বিচারিক অনুমোদন প্রয়োজন। প্রক্রিয়াটি সাধারণত নিম্নোক্ত ধাপ অতিক্রম করে :
- হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানি
- আপিল বিভাগে আপিল
- রিভিউ আবেদন
- রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা
এই প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হতে অনেক সময় ১০ থেকে ২০ বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মৃত্যুদণ্ড সংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে গড়ে এক দশকেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
বরগুনার আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি ২০২০ সাল থেকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তার আপিল এখনো বিচারাধীন। ফলে অনেক নারী বন্দি বছরের পর বছর কনডেম সেলে থাকলেও তাদের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় না।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী আছে, কিন্তু ফাঁসির মঞ্চ নেই
বাংলাদেশের কারা ইতিহাসে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যগুলোর একটি হলো দেশের বৃহত্তম নারী কারাগার কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে দীর্ঘদিন কোনো ফাঁসির মঞ্চ নির্মাণ করা হয়নি। কারা কর্মকর্তারা অতীতে জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হওয়ায় কারাগার নির্মাণের সময় সেখানে আলাদা ফাঁসির মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হয়নি। বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী বন্দিদের বড় অংশই এই কারাগারে রয়েছেন।
কারাগারে কতজন নারী মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত?
সাম্প্রতিক কারা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ২,৫৯৪ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির মধ্যে ৯৬ জন নারী (কালের কন্ঠ)। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বন্দি গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে। এই নারীদের অধিকাংশই হত্যা, পারিবারিক বিরোধ, শিশু হত্যা অথবা আলোচিত অপরাধমূলক মামলায় দণ্ডিত। সাম্প্রতিক সময়ে এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে কয়েকটি বহুল আলোচিত নাম
স্বপ্না
সাভারের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় দ্রুততম সময়ের বিচারে প্রধান আসামি সোহেল রানার সহযোগী স্বপ্নাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীদের আলোচিত তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
ইতিহাস কী বলে?
কারা অধিদপ্তরের বিভিন্ন তথ্য এবং সংবাদপত্রের সংরক্ষিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শত শত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও সেগুলোর সবই ছিল পুরুষ আসামির ক্ষেত্রে। ২০১০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্বাধীনতার পর ৪০০-এর বেশি ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্তত কয়েক ডজন নারীর কারও সাজা কার্যকর হয়নি। ২০২৪ সালেও দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এক রায়ে পুনরায় উল্লেখ করা হয় যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার নজির নেই।
ভবিষ্যতে কি ভাঙবে এই ৫৫ বছরের রেকর্ড?
প্রশ্নটি এখনো উন্মুক্ত। একদিকে আদালত নিয়মিতভাবে নারী আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছেন। অন্যদিকে উচ্চ আদালতের পুনর্বিবেচনা, দীর্ঘ আপিল প্রক্রিয়া, মানবিক বিবেচনা এবং বিচারিক নজরদারির কারণে সেই রায়গুলোর বড় অংশই পরিবর্তিত হচ্ছে।
ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে যে ব্যতিক্রমী রেকর্ড তৈরি হয়েছে, “কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি” তা এখনো অটুট রয়েছে। তবে বর্তমানে কনডেম সেলে থাকা প্রায় একশ নারী বন্দির ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কী অপেক্ষা করছে, সেই উত্তর ভবিষ্যতের আদালত ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে।

