বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এত দল কেন?

একটি প্রশ্ন, শত উত্তর। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এমন একটি দৃশ্য দেখা গেল, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকদের একইভাবে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মোট ৪৪টি সক্রিয় রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ১৩টি ইসলামপন্থী দল ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট নামের এই দীর্ঘ তালিকা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: একটিমাত্র ধর্মের নামে, মাত্র একটি দেশে, এত বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব হলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে চলবে না। এই বিভক্তির বীজ ছড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের মাটিতে, ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত এবং মুসলিম পরিচয়ের সংকটে, পাকিস্তান আন্দোলনের আদর্শিক তর্কে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিতে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী আলি রিয়াজের ভাষায়, “বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি কখনো একক বা একজাতীয় ছিল না এটি সবসময়ই বহুস্তরীয় এবং প্রতিযোগিতামূলক।এই নিবন্ধটি সেই বহুস্তরীয় ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা। ঔপনিবেশিক শাসন ও মুসলমানের পতন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার মুসলমান সমাজ এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান শাসকশ্রেণির হাত থেকে ক্ষমতা, ভূমি এবং প্রশাসনিক পদ একে একে চলে যায় হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ব্রিটিশ নিযুক্ত আমলাদের কাছে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে মডার্ন ইন্ডিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থ চ্যাটার্জি পর্যন্ত সকলেই এই পতনের ব্যাপ্তিকে স্বীকার করেছেন। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর গ্রামাঞ্চলের মুসলমান কৃষক সমাজের উপর হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ ইন্ডিগো চাষীদের শোষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পটভূমিতেই উদ্ভব হয় বাংলার প্রথম সংগঠিত ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের। ফরায়েজী আন্দোলন: ১৮১৮ সালে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। আন্দোলনটির লক্ষ্য ছিল ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব বা ফরজ পালনের উপর জোর দিয়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী চর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং অনৈসলামিক প্রথা দূর করা। মক্কায় দীর্ঘ অধ্যয়নের পর দেশে ফিরে শরীয়তউল্লাহ বাংলার মুসলমান কৃষকদের দুর্দশা এবং ধর্মীয় বিচ্যুতি দেখে মর্মাহত হন। তাঁর সংস্কার কার্যক্রম ছিল মূলত পীর ও মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলামের বিরুদ্ধে যা বাংলার সুফি ধারার সাথে তাঁর মৌলিক বিরোধ তৈরি করে। তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নেয় ঔপনিবেশিক করব্যবস্থা, জমিদারী শোষণ এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে জমিদারদের আঁতাতের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ হিসেবে বিকশিত হয়। ফরায়েজী আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: এটি প্রথমবারের মতো বাংলার মুসলমান সমাজকে দুটি ধারায় বিভক্ত করে একদিকে সংস্কারবাদী বা ‘শুদ্ধবাদী’ ইসলাম, অন্যদিকে সুফি ও পীরকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলাম। এই বিভাজন আজও বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্তর্গত বিরোধের একটি মূল উৎস। একই সময়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি ধারার আন্দোলন আরেকটি পৃথক ধারা তৈরি করে। ফরায়েজী ও ওয়াহাবি উভয়ই সংস্কারবাদী হলেও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য ছিল। এই প্রারম্ভিক বিভাজন পরবর্তী সকল বিভক্তির একটি আদিরূপ। পীর ও তরিকতের প্রভাব বাংলার ইসলামী রাজনীতিকে বুঝতে হলে সুফি তরিকা ও পীর-মুরিদ সম্পর্কের সামাজিক শক্তিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক অধ্যাপক আযীযুর রহমান মল্লিক তাঁর ‘British Policy and the Muslims in Bengal’গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার হয়েছিল মূলত সুফি শায়খদের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়। ফলে মুরিদদের উপর পীরের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব গ্রামীণ সমাজে এত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল যে, যেকোনো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে এই কাঠামোর সাথে লড়াই করেই এগোতে হয়েছে। পীরকেন্দ্রিক রাজনীতির এই উত্তরাধিকারই পরবর্তীকালে চরমোনাই পীর, আটরশি পীর এবং অন্যান্য দরগাহকেন্দ্রিক পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেবে। আলিগড় আন্দোলন ও বাংলার মুসলমান উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে ব্রিটিশ শাসনের সাথে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানায়। বাংলায় এর প্রভাব পড়েছিল শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের বৃহত্তর অংশ কৃষক, মাদ্রাসাশিক্ষিত আলেম, এবং পীরের মুরিদ এই সংস্কারধারার সাথে সম্পর্কিত অনুভব করেননি। ফলে শুরু থেকেই বাংলার ইসলামী আন্দোলনে একটি শ্রেণিগত ও শিক্ষাগত বিভাজন বিদ্যমান ছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম রাজনীতির উদ্ভব ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা বাংলার মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে স্বাগত হয়েছিল, কারণ নতুন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকা হলো নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। কিন্তু মুসলিম লিগও কখনো একক ও অখণ্ড ছিল না। একদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, পাশ্চাত্যশিক্ষিত আলিগড়পন্থী নেতৃবৃন্দ, অন্যদিকে পূর্ববাংলার কৃষক সমাজ এবং দেওবন্দি আলেমদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক হাসান নূরুল এই বিভাজনকে “ইসলামী রাজনীতির দুই নদীর মোহানা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একটি ধারা ছিল আধুনিক, জাতি-রাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে, অন্যটি ছিল ধর্মীয় আইন ও খেলাফত-ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে আবদ্ধ। খেলাফত আন্দোলন ও তার পরিণতি ১৯১৯-২৪ সালের খেলাফত আন্দোলন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ এনেছিল। ইসলামী বিশ্বের খলিফার সুরক্ষার দাবিতে মুসলমান ও হিন্দু এক মঞ্চে এলেও, তুরস্কে খেলাফতের বিলোপের পর এই আন্দোলন ভেঙে পড়ে। এর পরিণতি হয় মুসলিম রাজনীতির আরও বেশি বিভক্তি কেউ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ফেরেন, কেউ কেবল ধর্মীয় পুনর্জাগরণে মনোনিবেশ করেন, আর কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে যান। জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও মওদূদীর আদর্শ ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার আট দশক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা ‘হাকিমিয়্যাহ’-র ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দি ও সুফি ধারার সাথে কখনো পুরোপুরি মেলেনি। কওমি-ভিত্তিক ইসলামপন্থী নেতারা যুক্তি দেন যে জামায়াতের ধর্মতাত্ত্বিক অভিমুখিতা তাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন মওদূদীর নবী ও সাহাবীদের বিষয়ে কিছু অভিমত তারা বিধর্মী বলে মনে করেন। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজন পরবর্তীকালে রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি করেছে। পাকিস্তান আন্দোলনে জামায়াত সমর্থন দেয়নি, কারণ মওদূদী মনে করতেন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শ পূরণ করতে পারবে না। এই অবস্থান জামায়াতকে মুসলিম লিগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের আদর্শিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতি: দ্বন্দ্বময় পরিচয় ১৯৪৭-৭১ সালের পাকিস্তান যুগে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সমাজে একটি গভীর পরিচয়সংকট দেখা দেয়। প্রশ্নটি ছিল: তারা কি প্রথমে বাঙালি, নাকি প্রথমে মুসলমান? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সংকটকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে বাঙালি মুসলমানরা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। রাজনীতিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আলী তাঁর Bengali Muslims and the Language Movement গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক দাবি ছিল না এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির একটি নতুন সংজ্ঞার সন্ধান। এই সময় আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা ক্রমশ পাকিস্তানপন্থী অভিজাত শ্রেণির সাথে যুক্ত হয়, আর স্বতন্ত্র অর্থায়নে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বলয়
যে মানুষটির চিপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের AI বিশ্ব

প্রযুক্তি বিশ্বের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের দূরদর্শিতা শুধু একটি কোম্পানির ভাগ্য বদলে দেয় না, বরং পুরো একটি যুগের গতিপথ নির্ধারণ করে। জেনসেন হুয়াং সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি NVIDIA-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO), এবং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিপ্লবের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তাঁর ভাষায়, “কৌতূহলই অগ্রগতির সবচেয়ে বড় শক্তি। কখনোই প্রশ্ন করা এবং উত্তর খোঁজা বন্ধ করবেন না।” ১৯৬৩ সালে তাইওয়ানের তাইপেতে জন্মগ্রহণ করেন জেনসেন হুয়াং। শৈশবের একটি অংশ তাইওয়ানে কাটানোর পর তিনি পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। নতুন দেশে জীবন তাঁর জন্য সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার প্রয়োজনে তিনি রেস্তোরাঁয় বাসবয়, টেবিল পরিষ্কারকর্মীসহ বিভিন্ন খণ্ডকালীন কাজ করেছেন। এই সংগ্রামী জীবনই তাঁকে পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং অধ্যবসায়ের প্রকৃত মূল্য শিখিয়েছে। তাঁর নিজের কথায়, “নিজের কোনো কাজকেই ছোট মনে করবেন না। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই ভবিষ্যতের ভিত্তি।” শিক্ষাজীবনে তিনি Oregon State University থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে Stanford University থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি AMD এবং LSI Logic-এ কাজ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের গভীর অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে মিলে NVIDIA প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে কোম্পানির লক্ষ্য ছিল গেমিংয়ের জন্য গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPU) তৈরি করা। কিন্তু জেনসেন হুয়াং দ্রুতই বুঝতে পারেন GPU-এর সম্ভাবনা গেমিংয়ের বাইরেও অনেক বিস্তৃত। তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্তই NVIDIA-কে ধীরে ধীরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার, রোবোটিক্স, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সুপারকম্পিউটিংয়ের অন্যতম শক্তিতে পরিণত করে। আজ বিশ্বের অধিকাংশ আধুনিক AI প্রযুক্তি NVIDIA-এর GPU-এর ওপর নির্ভরশীল। তাই প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা তাঁকে প্রায়ই “AI যুগের অন্যতম স্থপতি” বলে অভিহিত করেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে, “এআই প্রযুক্তি আপনাকে সরাসরি চাকরি থেকে সরিয়ে দেয় না; বরং এআই ব্যবহার করতে পারা অন্য কেউ আপনার জায়গা নিয়ে নেয়।” জেনসেন হুয়াংয়ের জীবনের সবচেয়ে মানবিক ও অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। Oregon State University-তে পড়াশোনার সময় তাঁর পরিচয় হয় Lori Mills-এর সঙ্গে। একই ল্যাব পার্টনার হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা ধীরে ধীরে প্রেমে রূপ নেয়। একটি বহুল প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, জেনসেন একবার লরিকে বলেছিলেন, “আমার সঙ্গে পড়লে তুমি A গ্রেড পাবে।” পরবর্তীতে প্রায় পাঁচ বছরের সম্পর্কের পর ১৯৮৪ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁদের দাম্পত্য জীবন অত্যন্ত দৃঢ় ও স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে চলছে। জেনসেন বিভিন্ন সময়ে স্বীকার করেছেন, জীবনের কঠিন সময়গুলোতে লরির সমর্থন তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি। তাঁর উপলব্ধিতে, “যাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি, তাদের ধৈর্য এবং সহনশীলতা কম থাকে। কিন্তু এগুলোই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি।” নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জেনসেন হুয়াংয়ের দর্শন খুবই স্পষ্ট, কোনো সাফল্যই চূড়ান্ত নয়। আত্মতুষ্টি একটি প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে পিছিয়ে দেয়। তাই তিনি সবসময় বিশ্বাস করেন, শেখা, পরিবর্তন এবং উদ্ভাবনই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। তাঁর আরেকটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো কালো লেদার জ্যাকেট, যা আজ NVIDIA-এর এক ধরনের প্রতীকী পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। বড় কোনো প্রযুক্তি ইভেন্ট বা ঘোষণা অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রায়ই এই পোশাকে দেখা যায়। যা তাঁর সরল কিন্তু আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন। ২০০৭ সালে তিনি ও তাঁর স্ত্রী মিলে Jen-Hsun & Lori Huang Foundation প্রতিষ্ঠা করেন, যা শিক্ষা, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রযুক্তি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন IEEE Medal of Honor, IEEE Founders Medal, Robert N. Noyce Award, imec Lifetime of Innovation Award, Ernst & Young Entrepreneur of the Year সহ বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডক্টরেট। তাঁর আরেকটি শক্তিশালী বিশ্বাস হলো, “সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কোনো ঝুঁকিই না নেওয়া।” ডিশওয়াশার এবং রেস্তোরাঁর কাজ থেকে শুরু করে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পৌঁছানোর এই যাত্রা শুধুমাত্র সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, কৌতূহল, দূরদর্শিতা এবং মানবিক সম্পর্কের এক অসাধারণ উদাহরণ। জেনসেন হুয়াং দেখিয়ে দিয়েছেন, সীমিত সুযোগ কখনোই বড় স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না। যদি থাকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, কঠোর পরিশ্রম এবং শেখার অদম্য ইচ্ছা।তাঁর এই কথাটিই যেন পুরো জীবনের সারসংক্ষেপ হয়ে ওঠে “আপনি যদি ব্যর্থ হতে ভয় পান, তাহলে কখনোই বড় কিছু অর্জন করতে পারবেন না।
সাত মাসের রাজনীতি কি মুছে দিল দুই দশকের ক্রিকেট গৌরব? | সাকিব আল হাসানের গল্প

“বাংলাদেশের সর্বকালের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা আপনি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে আপনার অবদান আপনার শত্রুও স্বীকার করবে। কিন্তু আপনার মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে সাত মাসের রাজনীতিটাই বড় হয়ে গেল এবং এর জন্য আপনি ভুগছেন। এটা কতটা অপ্রত্যাশিত?” এক সাক্ষাৎকারদাতার প্রশ্নে,ফোনের ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। তারপর সাকিব আল হাসানের কণ্ঠ ভেসে আসে— “শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, আমার কাছে অগ্রহণযোগ্যও। কিন্তু এটা নিয়ে আর কীই-বা বলব! আপনি তো তা-ও বলছেন যে সাত মাস রাজনীতির কথা । অনেকে তো বলে যে একটা ফেসবুক পোস্ট না দেওয়াতেই নাকি আমার এই দশা … মানে কী একটা অবস্থা!” এই “কী একটা অবস্থা” — হয়তো এই চার শব্দেই লুকিয়ে আছে সাকিব আল হাসানের পুরো জীবন। People are not born heroes or villains; they are born people, and the world decides what to call them.” লাইনটা যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যায় সাকিব আল হাসানের জীবনের সঙ্গে। একসময় যাকে বাংলাদেশ দেখেছে অলৌকিক প্রতিভা হিসেবে, পরে তাকেই কেউ বলেছে অহংকারী, কেউ বিতর্কিত, কেউ আবার দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। যেন তিনি একই সঙ্গে নায়কও, খলনায়কও। আর ঠিক এখানেই সাকিব আল হাসানের গল্পটা আলাদা। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন প্রতিভা দ্বিতীয়টি আসেনি। ক্রিকেট বিশ্বে অলরাউন্ডার এসেছে অনেক, কিন্তু তিন ফরম্যাটেই এক নম্বর অলরাউন্ডার হওয়ার মতো দানবীয় ধারাবাহিকতা খুব কম মানুষই দেখাতে পেরেছে। সাকিব সেই বিরলদের একজন। এমন একজন, যিনি একই ম্যাচে ব্যাট হাতে সেরা, বল হাতে সেরা, আবার কখনো দলের সবচেয়ে ঠান্ডা মাথার ক্রিকেটারও। তিনি নিজেই বলেছেন, “বাংলাদেশের হিসাবে সময়ের আগে আমি অনেক কিছু করে ফেলছি।” লাইনটা অহংকারের মতো শোনাতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটে ফ্র্যাঞ্চাইজি সংস্কৃতি, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং, ক্রিকেটারের স্বাধীনতা—এই ধারণাগুলো সবার আগে স্বাভাবিক করেছিলেন সাকিবই। আজ যেটা সাধারণ, একসময় সেটার জন্য তাকেই “দেশদ্রোহী” বলা হয়েছিল। মাগুরার ফয়সাল থেকে “সাকিব আল হাসান” হয়ে ওঠার গল্পটা সিনেমার মতো। ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চ মাগুরায় জন্ম নেওয়া সাকিব ছোটবেলা থেকেই ছিলেন খেলাপাগল। গ্রামের মাঠে তাঁর প্রতিভা এতটাই আলাদা ছিল যে বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁকে ভাড়া করে খেলতে নিয়ে যাওয়া হতো। এক স্থানীয় ম্যাচে তাঁর খেলা দেখে মুগ্ধ এক আম্পায়ার তাঁকে মাগুরার ইসলামপুর পাড়া ক্লাবে অনুশীলনের সুযোগ করে দেন। সেখানেই সত্যিকারের ক্রিকেট বলে জীবনের প্রথম বল করেই উইকেট তুলে নেন সাকিব। টেপ টেনিস থেকে উঠে আসা ছেলেটি খুব দ্রুতই ব্যাট ও বল—দুই হাতেই নিজের আলাদা সামর্থ্যের জানান দিতে শুরু করেন। এরপর বিকেএসপিতে স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ, খুলনা বিভাগে সুযোগ এবং খুব অল্প বয়সেই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক। ২০০৫ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে মাত্র ৮৬ বলে সেঞ্চুরি ও তিন উইকেট নিয়ে সাকিব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—বাংলাদেশ ক্রিকেট এক অসাধারণ প্রতিভাকে পেতে যাচ্ছে। ফরাসি লেখক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, “দুনিয়ার কোনো শক্তিই সেই ধারণাকে থামাতে পারে না, যার সময় এসে গেছে।” সাকিবের সময়টাও তখন এসে গিয়েছিল। বিকেএসপির মাত্র ছয় মাসের সংক্ষিপ্ত কিন্তু নিবিড় প্রশিক্ষণ সাকিবের ভেতরের বারুদকে আরও ধারালো করে তোলে। ২০০৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৭ অভিষেকেই ৩ উইকেট নিয়ে সাকিবের পথচলা শুরু। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৮২ এবং ফাইনালে ৮৬ বলে সেঞ্চুরির সাথে ৩ উইকেট নিয়ে তিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দেন। যুব ওয়ানডেতে ১৮ ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৫৬৩ রান ও ২২ উইকেট। ১৭ বছর বয়সে খুলনার হয়ে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেকের পর, ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ে ‘এ’ দলের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়ে নিজের জাত চেনান। সাকিবের এই শুরুর দিনগুলো দেখে বিখ্যাত কবি টি এস এলিয়টের সেই লাইনটি মনে পড়ে যায়— “Home is where one starts from.” নিজের ঘরোয়া ভিতটা তিনি এতটাই শক্ত করে গড়েছিলেন যে বিশ্ব জয় করা তাঁর জন্য কেবল সময়ের ব্যাপার ছিল। সাকিব আল হাসান বিশ্ব ক্রিকেটের এক যাযাবর ফেরিওয়ালা (Globetrotter)। বোর্ডের অনাপত্তিপত্র (NOC) জটিলতায় পিএসএল বা এলপিএলের বেশ কিছু আসরে খেলতে না পারলেও, ২০২৩ লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে গল মার্ভেলসের হয়ে ২১ বলে ৩০ রান ও ২ উইকেট নিয়ে চেনা দাপট দেখান। আইসিসির নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০২০ সালের বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপে ফিরেই তিনি গড়েন অনন্য ইতিহাস; বিশ্বের মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে ৫০০০ রান ও ৩০০ উইকেটের মহাকাব্যিক অলরাউন্ড ডাবল অর্জন করেন। ২০২২ স্বাধীনতা কাপেও তিনি ব্যাটে-বলে দলকে দুর্দান্ত জয় এনে দেন। বিতর্ক কিংবা মাঠের বাইরের ঝড়—কোনো কিছুই তাঁর ভেতরের ক্রিকেটার সত্ত্বাকে দমাতে পারেনি; তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন, গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতোই ধ্বংসস্তূপ থেকে বারবার ডানা মেলে আকাশে ওড়াটায় তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। সাকিব আল হাসান কখনো নিজেকে কেবল ২২ গজের বৃত্তে আটকে রাখেননি। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন কার্ড পাওয়ার পর তাঁর জীবন আরও বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে। ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর কিংবা হুয়াওয়ের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের সাথে যুক্ত থেকে তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। একই সাথে মোনার্ক হোল্ডিংসের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্পোরেট জগতে পা রাখা কিংবা ‘বুরাক কমোডিটিজ’-এর মাধ্যমে স্বর্ণের ব্যবসায় প্রবেশ—সাকিব মাঠের বাইরের জীবনেও এক রোমাঞ্চকর অলরাউন্ডার হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মাঠের বাইরের এই বাউন্সারগুলো সামলানো তাঁর জন্য ক্রিকেটের চেয়েও অনেক বেশি কঠিন প্রমাণিত হয়েছিল। সাকিবের জীবনের সবচেয়ে বড় জুয়াটি ছিল সম্ভবত রাজনীতি। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ শহর মাগুরা-১ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, মাত্র সাত মাস পরেই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে সংসদ ভেঙে দিলে তাঁর সাংসদ পদের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের নির্বাচনে মাগুরা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মুনোয়ার হোসেন খান নির্বাচিত হলে সাকিবের রাজনৈতিক অধ্যায়ের ওপর যবনিকা পড়ে। বিখ্যাত আইরিশ নাট্যকার জর্জ বার্নার্ড শ লিখেছিলেন, “রাজনীতি হলো অজ্ঞদের দ্বারা চালিত এবং জ্ঞানীদের দ্বারা শাসিত হওয়ার এক নির্মম প্রক্রিয়া।” সাকিব হয়তো সেই নির্মমতারই মুখোমুখি হয়েছেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ চাঁছাছোলা ভাষায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন: “একটা সময় দেখতাম যে সবাই আওয়ামী লীগ করে, আর এখন দেখি যে কেউই আওয়ামী লীগ করে না। এরকম একটা অবস্থা।” যখন তাঁকে প্রশ্ন করা হয় খেলোয়াড়ি জীবনেই কেন রাজনীতিতে এলেন, তখন মাঠের অহংকারী সাকিব মুহূর্তেই মাগুরার সেই চেনা ছেলেটি হয়ে যান। আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “কখনো মাগুরাতে সাকিব আল হাসান হইনি। আমি সবসময় মাগুরাতে ফয়সালেই ছিলাম।” রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে চারপাশের তীব্র সমালোচনার জবাবে তিনি এখনো নিজের অবস্থানে অনড়, অকপটে বলেন, “আমি মনে করি যে আমি ভুল কিছু করি নাই।” রাজনীতির পালাবদলের পর সাকিবের ওপর নেমে আসে একের পর এক আইনি ও আর্থিক খড়্গ। আড়াইশ কোটি টাকার পুঁজিবাজার কারসাজির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর সমস্ত নথিপত্র জব্দ করে। অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রলুদ্ধ করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই চক্রে তিনি সক্রিয় ছিলেন। অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই তদন্ত ও মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে বর্তমানে সাকিবের জীবন কাটছে দূর পরবাসে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। একদা মিরপুর স্টেডিয়ামে যার এক নজর দর্শনের জন্য হাজারো মানুষ ভিড় করত, আজ সেখানে ফেরার পথটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় গোলকধাঁধা। আগামীতে দেশে ফিরলে প্রথমে
কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায় গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ

ঈদুল আজহা শেষ হলেই একসময় রাস্তায়-ডাস্টবিনে পড়ে থাকত কোরবানির চামড়া। অনেকে হতাশ হয়ে ফেলে দিতেন। কিন্তু সেই ছবিটা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আজ চামড়া আর নষ্ট হয় না, বরং সেটা হয়ে উঠছে এতিম, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আর দরিদ্র পরিবারের জন্য একটা বড় সহায়তা। আগের দিনগুলো কেমন ছিল? কয়েক বছর আগেও চামড়া সংগ্রহের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। পাড়ার ছেলেরা সারাদিন রোদে ঘুরে মাত্র ৫০-১০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করত। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম পেত না বলে অনেকে রাগ করে চামড়া রাস্তায় ফেলে দিত। ফলে একদিকে দেশের সম্পদ নষ্ট হতো, অন্যদিকে এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো তাদের প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত হতো। কে বদলে দিল ছবিটা? ২০২২ সাল থেকে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ নামের একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই কাজটা হাতে নিয়েছে। তারা চামড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সুন্দরভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার মাঠে প্রতি ঈদে তারা লক্ষাধিক চামড়া সংরক্ষণ করে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশে প্রায় ২৫০টির বেশি মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এই চামড়ার আয় থেকে উপকার পাচ্ছে। ৭ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর অক্লান্ত পরিশ্রম প্রতি ঈদে গাউসিয়া কমিটির প্রায় সাত হাজার স্বেচ্ছাসেবী মাঠে নেমে পড়েন। তারা চামড়া সংগ্রহ করেন, সঠিক জায়গায় নিয়ে যান এবং ভালোভাবে সংরক্ষণ করেন। তাদের এই নিষ্ঠার কারণে চামড়া নষ্ট হওয়া অনেক কমেছে এবং দামও কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। কী কী পরিবর্তন হয়েছে? সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হলো, চামড়া আর আগের মতো অপচয় হয় না। রাস্তায় পড়ে নষ্ট হওয়া বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য এখন অনেক কম দেখা যায়। সংগঠিত সংগ্রহের কারণে প্রায় সব চামড়াই এখন সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে এবং দেশের সম্পদ হিসেবে রক্ষা পাচ্ছে। এর পাশাপাশি এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো নামমাত্র টাকা পেত, সেখানে এখন চামড়া বিক্রির আয় অনেক বেশি। সারাদেশের ২৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এই আয় থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে, যা তাদের খাবার, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। চামড়া ব্যবস্থাপনায়ও একটা স্পষ্ট শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দখলদারিত্ব অনেকটাই কমেছে। স্বেচ্ছাসেবীরা সরাসরি মাঠ থেকে সংগ্রহ করায় মাঝখানের অসাধু মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব কমে গেছে। ফলে চামড়ার দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং ব্যবস্থাটা আর আগের মতো অগোছালো নেই। সবথেকে সুন্দর পরিবর্তন হয়েছে মানুষের মনে। যারা একসময় হতাশ হয়ে চামড়া ফেলে দিতেন, তারা এখন নিশ্চিন্তে চামড়া দিচ্ছেন। কারণ তারা জানেন, তাদের কোরবানির এই চামড়া সত্যিই এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কাজে লাগছে। এতে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটা আত্মিক সন্তুষ্টিও তৈরি হয়েছে। এভাবেই গাউসিয়া কমিটির উদ্যোগ একটা ধর্মীয় উৎসবকে ধীরে ধীরে একটি অর্থবহ সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করছে। কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা এখন শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা একটা সুন্দর সামাজিক দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। গাউসিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা যেভাবে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী: রাষ্ট্রের না দলের ?

একটি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাই। কিন্তু যখন প্রশাসনিক কাঠামো দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। আর সেই দুর্বলতার পরিণতিতে গণতন্ত্র কেবল সংকটাপন্নই হয় না, অনেক সময় তার অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দল তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্র কখনোই পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে এখানে গণতন্ত্রের আবরণে বিভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ও বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সেনা অভ্যুত্থান, দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশাবাদ তৈরি করলেও, ১৯৯১ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই প্রত্যাশাকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মাগুরার উপনির্বাচন, ১৯৯৬ সালের একক নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্রমাগত দুর্বল করে তোলে। তবে ২০০৮ সালের পর পরিস্থিতি আরও গভীর সংকটে রূপ নেয়, যখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তারা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অধীন, তবুও তাদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট আইন ও আচরণবিধি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়শই সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় আনুগত্য, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি ও প্রভাব অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ ধারণের বিষয়টি বক্তৃতায় তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। অথচ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি-২৫ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে এই ধরনের ঘটনা শুধু আচরণবিধির লঙ্ঘনই নয়, বরং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার জন্যও বড় হুমকি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে দলীয়করণ ও আজ্ঞাবহ প্রশাসন একটি রাষ্ট্রকে কতটা বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে এবং নাগরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির পথে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি এমপি ও মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে পদোন্নতির জন্য ডিও লেটার প্রদানও এখন প্রকাশ্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার বিধি-২০ এবং বিধি-৩০ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক বা বাহ্যিক প্রভাব ব্যবহার করতে পারেন না। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এ অসদাচরণের জন্য তিরস্কার, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ না থাকায় এসব বিধান অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো ব্যবস্থা নয়; এটি মূলত প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির ভিত্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশাসন রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সংবিধান, আইন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। অন্যথায় প্রশাসনের মেধা ও পেশাদারিত্ব রাজনৈতিক তোষণ ও দলীয় স্বার্থের কাছে বারবার পরাজিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল ও অকার্যকর করে তুলতে পারে।
“দ্য ফরটি রুলস অব লাভ”: আধ্যাত্মিকতার আড়ালে রোমান্টিক আবেগের উপন্যাস

“ইশ্বর এক সুনিপুণ ঘড়ি প্রস্তুতকারক। পৃথিবীতে যা হয়, ঠিক তার সময়মতোই হয়। এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না। সবার জন্য সেই ঘড়ি একইভাবে কাজ করে। সেই ঘড়িতে প্রত্যেকের ভালোবাসা আর মৃত্যুর সময় সুনির্দিষ্ট।” বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস The Forty Rules of Love পাঠকদের সামনে আধ্যাত্মিক ভালোবাসা, সুফি দর্শন এবং আত্মঅন্বেষণের এক রহস্যময় জগৎ তুলে ধরেছে। তুর্কি লেখিকা এলিফ শাফাক এই উপন্যাসে প্রেম, ধর্ম, আত্মিক মুক্তি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বইটি অনেক ক্ষেত্রেই সুফিবাদের প্রকৃত দর্শনের চেয়ে রোমান্টিক আবেগ এবং পার্থিব সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে ত্রয়োদশ শতকের মহান সুফি কবি Jalal ad-Din Muhammad Rumi এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক Shams Tabrizi-কে ঘিরে। একইসঙ্গে আধুনিক সময়ের এলা নামের এক নারীর ব্যক্তিগত সংকটও সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে। লেখক এই দুই ভিন্ন সময়কে মিলিয়ে ভালোবাসা ও আত্মিক মুক্তির একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়েছেন। উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এলা—চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী, যার দীর্ঘ বিশ বছরের সংসার এবং তিনটি সন্তান রয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের অনলাইন আলাপ ও একটি পাণ্ডুলিপির প্রভাবে তিনি নিজের পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লেখক এই ঘটনাকে আত্ম-আবিষ্কার বা আত্মিক জাগরণ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তবে বাস্তবতার দৃষ্টিতে এটি আত্মিক মুক্তির চেয়ে বরং দায়িত্বহীনতার এক রোমান্টিক উপস্থাপন বলেই মনে হয়। এলার জীবনের শূন্যতা, একঘেয়েমি ও আবেগগত অপূর্ণতাকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন সংসার ভেঙে বেরিয়ে আসাই মুক্তির একমাত্র পথ। ফলে এখানে আত্মিক উপলব্ধির চেয়ে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের জয়গানই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বইটির মূল আকর্ষণ “চল্লিশটি প্রেমের নীতি” বা “Rules of Love”। কিন্তু উপন্যাস যত এগোয়, ততই বোঝা যায়—এখানে স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের চেয়ে মানবিক সম্পর্ক, মানসিক আকর্ষণ এবং আবেগঘন সংযোগের দিকগুলোই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অথচ সুফিবাদের মূল দর্শন হলো আত্মার পরিশুদ্ধি, অহংবোধের বিলুপ্তি এবং স্রষ্টার প্রেমে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। কিন্তু এই উপন্যাসে বারবার পার্থিব ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক ভালোবাসাকে প্রায় একই স্তরে দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে আধ্যাত্মিকতার গভীরতা অনেকাংশেই রোমান্টিক আবেগের ভিড়ে চাপা পড়ে গেছে। উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র শামস তাবরিজিকেও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তিনি এক রহস্যময় অলৌকিক চরিত্র—যিনি মানুষের মন পড়তে পারেন কিংবা অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে শামস ছিলেন আত্মিক জাগরণের একজন পথপ্রদর্শক, কোনো জাদুকরসুলভ চরিত্র নন। সুফিবাদের মূল শিক্ষা অলৌকিকতা প্রদর্শন নয়; বরং আত্মসংযম, ধৈর্য, বিনয় এবং স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন। অথচ উপন্যাসে শামসকে অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক রহস্যবাদী চরিত্রের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটিতে ভালোবাসার কথা বলা হলেও সেই ভালোবাসা বারবার দৈহিক ও মানসিক চাহিদার বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে। শামস মুখে পার্থিব প্রেমকে অতিক্রম করার কথা বললেও কাহিনির বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যক্তিগত আকর্ষণ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আবেগের দ্বন্দ্ব। ফলে প্রশ্ন জাগে—এই উপন্যাস কি সত্যিই স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার গল্প, নাকি মানবিক প্রেমকে আধ্যাত্মিকতার ভাষায় ব্যাখ্যা করার একটি সাহিত্যিক প্রয়াস? বইটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ সম্ভবত শামস ও কিময়ার বিয়ের প্রসঙ্গ। শামসকে যেখানে উচ্চমাত্রার আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেখানে কিময়ার প্রতি তাঁর দূরত্ব, মানসিক অবহেলা এবং কিময়ার করুণ পরিণতি পুরো কাহিনির সঙ্গে এক ধরনের নৈতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। সবশেষে বলা যায়, সহজ ভাষা, আবেগময় উপস্থাপন এবং দার্শনিক আবহের কারণে The Forty Rules of Love বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু যারা প্রকৃত সুফিবাদ, রুমি-শামসের ঐতিহাসিক সম্পর্ক কিংবা আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীরতা খুঁজতে চান, তাদের জন্য বইটি অনেকাংশে হতাশাজনক হতে পারে। আধ্যাত্মিকতার গভীর সত্যকে স্পর্শ করার বদলে উপন্যাসটি অনেক জায়গায় রোমান্টিকতা ও ব্যক্তিগত আবেগকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। তাই এটি হয়তো নিখাদ সুফি দর্শনের বই নয়; বরং আধ্যাত্মিকতার আবরণে লেখা এক আবেগনির্ভর সাহিত্যিক উপন্যাস।
দ্রোহের আড়ালে যে মানুষটি শুধু একজন বাবা

কলকাতা পুলিশ নজরুলের বাড়ি তল্লাশি করতে এল। যদি কোনো নিষিদ্ধ বই পাওয়া যায়। বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা ছিল তখন বাজেয়াপ্ত। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পুলিশ কিছু পেল না। তল্লাশিতে নজরুল কোনো বাধা দেননি। বাড়ির জিনিসপত্র সব লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। একটা সময় পুলিশের নজর গেল একটা বাক্সের দিকে। ওই দিকে এগিয়ে যেতেই কবি পাগলের মতো হয়ে গেলেন। তল্লাশি দলে থাকা পুলিশের প্রধান কর্মকর্তাকে বললেন, ‘আর যা-ই করুন, এ বাক্সে হাত দেবেন না।’ পুলিশ জেদ করে বাক্স খুলে দেখলেন। সেখানে ছোট একটি ছেলের জামা, খেলনা সুন্দরভাবে সাজানো। সেগুলো ছিল নজরুলের প্রয়াত ছেলে বুলবুলের স্মৃতি। লজ্জিত পুলিশ কর্মকর্তা দেখলেন, নজরুলের চোখে পানি টলমল করছে। দ্রোহের কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে যাঁর পরিচয়, তাঁর মনে পুত্রস্নেহের এই কোমল দিকটি উঠে এসেছে আরেক ছেলে কাজী সব্যসাচীর স্মৃতিচারণামূলক লেখা ও সাক্ষাৎকারে। বাবা হিসেবে সন্তানদের নিয়ে খুব ভাবতেন। চার বছরের ছোট্ট বুলবুল যখন মারা যায়, তখন তিনি পুত্রশোকে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। বাবা প্রসঙ্গে কাজী সব্যসাচী বলেছিলেন, ‘এমন উদার হৃদয়বান বাবা কজন পেয়েছেন, জানি না। এদিক দিয়ে আমরা দুই ভাই ছিলাম সত্যিই ভাগ্যবান।’ কাজী সব্যসাচীর ডাকনাম সানি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রিয় চীনের বিপ্লবী নেতা সান-ইয়াৎ সেনের নাম থেকে এ নাম রাখা হয়। আর লেনিনের নাম অনুসরণে কাজী অনিরুদ্ধকে ‘নিনি’ নামে ডাকতেন কবি। কাজী নজরুলের চার ছেলে ছিল। প্রথম ছেলে কৃষ্ণ মুহম্মদ খুব ছোট বয়সেই মারা যায়। দ্বিতীয় ছেলে অরিন্দম বুলবুল মাত্র চার বছর বয়সে বসন্ত রোগে মারা যায়। ‘তোমার সানি যুদ্ধে যাবে/ মুখটি করে চাঁদ পানা/ কোল ন্যাওটা তোমার নিনি/ বোমার ভয়ে আধখানা…’—ছেলে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধকে নিয়ে এ ছড়াটি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন বাবা কাজী নজরুল ইসলাম। দুই ছেলেকে নিয়ে আরও ছড়া বানিয়েছিলেন নজরুল, ‘সানি নিনি দুই ভাই/ ব্যাং মারে ঠুইঠাই।’কাজী সব্যসাচীর এক স্মৃতিচারণায় জানা যায়, যখন নজরুল পরিবার থেকে দূরে কোথাও যেতেন, নিয়মিত দুই ছেলেকে চিঠি লিখতেন। সব চিঠির শেষে থাকত ‘আমার চুমু নিও। ইতি বাবা।’ অসুস্থ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে নজরুল কলকাতার বাগুইআটিতে একটা বাড়ি করার কথা ভেবেছিলেন। সেখানে কয়েক বিঘা জমির বায়নার টাকাও আগাম দিয়েছিলেন। প্রায়ই পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি সে জমি দেখতে যেতেন। বাসস্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন এইভাবে—‘বাড়িটা হবে বাংলো প্যাটার্নের। সামনে বা মাঝখানে একটা পুকুর থাকবে। পুকুরে মাছ ছাড়া হবে। প্রয়োজনমতো জাল কিংবা ছিপ ফেলে তা ধরা হবে। দক্ষিণ দিকে থাকবে আমার আর নিনির ঘর। তবে পুকুরের কাছে নিনি যাতে না যায়, তারও একটা ব্যবস্থা থাকবে, নিনি বড় শান্ত। সাঁতার জানে না।’ তবে সেখানে জমি কেনা হয়নি নজরুলের, বাড়িও করা হয়নি। একদিন সবাইকে নিয়ে বাগুইআটিতে গেছেন জমি দেখতে। কোথায় বাগান হবে, কোথায় বৈঠকখানা—এসব কথা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ কী একটা উৎকট গন্ধে হকচকিয়ে গেলেন কবি। ওই সময় রাস্তা দিয়ে ময়লা ফেলা গাড়ি যাচ্ছিল। নজরুল নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পকেট থেকে সুগন্ধি বের করে নিজের নাকে লাগালেন। দুই ছেলের নাকে নাকে ঘষে দিয়ে বললেন, ‘না, এখানে বাড়ি করা হবে না। এই দুর্গন্ধে আমার লেখাটেখা বেরোবে না। ছেলেরা মারা পড়বে।’ দুই ছেলে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে প্রায়ই নাটক-সিনেমা দেখতে যেতেন নজরুল। বাড়ির বাইরে ছেলেদের নিয়ে গেলে সব সময় লক্ষ রাখতেন। কবি সময় পেলেই ফুটবল খেলা দেখতে যেতেন। একদিন দুই ছেলেকে নিয়ে নজরুল আইএফএ শিল্ডের মোহামেডান স্পোর্টিং বনাম কেওসিবির খেলা দেখতে গেছেন। খেলা শেষে হঠাৎ খেয়াল করলেন, সঙ্গে দুই ছেলে নেই। রীতিমতো চিৎকার শুরু করেছিলেন নজরুল, ‘সানি কোথায়, নিনি কোথায়?’ মাঠসুদ্ধ লোক হাঁ করে দেখছে। শেষে দুই ছেলে পেয়ে ট্যাক্সি করে বাড়ি এসে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। আদরের পাশাপাশি শাসনেও ছিল নজরুলের নিজস্ব রীতি। একদিন দুপুরবেলা পরিবারের বড় সদস্যদের নিয়ে জমিয়ে তাস খেলছিলেন নজরুল। এই সময় সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ পাশের ঘরে কী করা যায়, সেই ভাবনায় অস্থির। অনিরুদ্ধ দেশলাই জোগাড় করে আনলেন। সব্যসাচী কাঠি জ্বালিয়ে সোফায় ধরিয়ে দিলেন আগুন। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে চিৎকার শোনা গেল। হন্তদন্ত হয়ে সবাই ছুটলেন পাশের ঘরে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। দুটো সোফাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বুঝতে কারও বাকি রইল না এ কাদের কীর্তি। হুংকার ছেড়ে চোখ পাকিয়ে নজরুল এমন করে দুই ছেলের দিকে তাকালেন যে দুই ভাইয়ের হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল।
শেরে বাংলা ফজলুল হক বুঝেছিলেন পাকিস্তান টিকবে না

কলকাতার বাবুরা বলেছেন, “ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “ এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক । শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । ১৯১৮ -১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব । ১৯৩৭ এর নির্বাচনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে জিতলে তিনি জমিদারি প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করবেন। তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন তার জন্য সারা বাংলাদেশ আর কলকাতার জমিদাররা একত্র হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। লাভ হয়নি — কৃষকরা তাদের নেতাকে ভোট দিয়েছেন। মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব । ১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পাঞ্জাবের মওলানা জাফর আলী খান, সীমান্ত প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধের স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী ঈসা ফজলুল হকের প্রস্তাব সমর্থন করেন। কনফারেন্সে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকার কারণে ফজলুল হক খুবই উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা উত্তেজিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে একবার বলেন, ‘ আমি আগে মুসলিম, পরে বাঙালী (muslim first, bengali afterwards)’। বক্তৃতার এক পর্যায়ে এসে বলেন, ‘কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে যদি আর কোনো মুসলিম নির্যাতিত হয় তাহলে আমি বাংলার হিন্দুদের উপর তার প্রতিশোধ নেব।’ যে ফজলুল হক তিন বছর আগে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমউদ্দিনকে রেখে শ্যামাপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছেন সেই ফজলুল হকের মুখে এমন বক্তব্য তখনকার ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃাষ্ট করেছিল। বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি টাইপ করার সময়ে ভুল করে muslim majority states লেখা হয়েছে; আসলে হবে state । জিন্নাহর ধারণা ছিল, দেন-দরবার করে দুই পাশে দুইটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই স্টেটস এর জায়গায় স্টেট লিখে একটা মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্র করতে হবে। জিন্নাহর এই ধূর্ততার কারণে ফজলুল হক তার সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হননি। তরুণ শেখ মুজিব যখন জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তখন অভিজ্ঞ ফজলুল হক পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। ‘তিঁনি অনুমান করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কী কী দুর্দশা হবে বাংলার মানুষের। তাই তিঁনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন……. “বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চাননা এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়েই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন- দাঁড়িয়ে বললেন,”যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।” এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।” বঙ্গবন্ধু ‘ র বাবা বলেছেন , ” বাবা তুমি যাই করো শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলো না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হয়নি। “ ফজলুল হক জানতেন মাঝখানে ভারতকে রেখে পশ্চিম আর পূর্বে জোড়া দিয়ে এক পাকিস্তান করলে তা কখনো টিকবে না। ‘ জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে ফেলেছে -বলে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেননি। ১৯৪৬ এ এসে জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর দুই বাংলা একত্র করে স্বাধীন যুক্তবাংলার দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাও ভাগ করতে হল। ফজলুল হক বলেছিলেন, একটি পাকিস্তান কখনও টিকবে না। বাংলা এবং আসামকে নিয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে। ১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, ফজলুল হকের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতবাণী সঠিক। ১৯৭১ এর মত এমন কিছু যে ঘটবে শেরে বাংলা ফজলুল হক তা আঁচ করতে পেরেছিলেন ১৯৪০ সালেই। তাই তিনি ১৯৪০ সালেই বাংলা আর আসাম নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯৭১ এর যুদ্ধ হল ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব ফজলুল হক যেভাবে উত্থাপন করে ছিলেন সেভাবে মানলে একাত্তরে এই দেশে রক্তগঙ্গা বইত না। পেশাজীবনে ‘কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী ছিলেন। একদিন তাঁর জুনিয়র হাতে একগাদা পত্রিকা নিয়ে এসে বললেন, ” স্যার , দেখুন , কলকাতার পত্রিকাগুলো পাতার পর পাতা লিখে আপনার দুর্নাম ছড়িয়ে যাচ্ছে — আপনি কিছু বলছেন না । ” তিঁনি বললেন, ” ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখছে তার মানে হল আমি আসলেই পুর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকদের জন্য কিছু করছি। যেদিন ওরা আমার প্রশংসা করবে সেদিন মনে করবে বাংলার কৃষক বিপদে আছে। “ মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বরিশাল বারের নামকরা উকিল । একবার ওয়াজেদ আলী র প্রতিপক্ষ মামলার ইস্যু জটিল হওয়ার কারণে কলকাতা থেকে তরুণ উকিল ফজলুল হককে নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীকে মোকাবেলা করার জন্য । ফজলুল হক ওই সময়ে কেবলমাত্র ফজলুল হক , শেরে বাংলা তখনও হননি । তিনি মামলা লড়তে এসেছেন , কিন্তু বিপক্ষের উকিল কে সেই খবর জানতেন না ।