ডিজিটাল সাম্রাজ্যবাদ আমাদের ডেটা, তাদের রাজত্ব

সকালে ঘুম থেকে উঠে গুগলে কিছু খোঁজা, দুপুরে নেটফ্লিক্সে সিনেমা দেখা, আর রাতে ফেসবুক বা ইন্সটাগ্রামে স্ক্রল করা—এগুলো এখন আমাদের দৈনন্দিন রুটিন। কিন্তু কখনো কি ভেবেছেন, এই প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের শুধু সুবিধাই দিচ্ছে না, বরং নীরবে আমাদের ওপর এক নতুন ধরনের আধিপত্য বিস্তার করছে? গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা একেই বলছেন “প্ল্যাটফর্ম ইম্পেরিয়ালিজম” বা ডিজিটাল সাম্রাজ্যবাদ। অনেকেই বলেন, “আগের যুগে সাম্রাজ্য বিস্তার হতো অস্ত্র, সৈন্য আর দখলদারিত্ব দিয়ে; আর আজকের যুগে তা হচ্ছে অ্যালগরিদম, ইন্টারনেট আর আমাদের ব্যক্তিগত ডেটা দিয়ে।” সহজ কথায়, বিশ্বের মুষ্টিমেয় কয়েকটি বিশাল টেক কোম্পানি, যেমন—গুগল, মেটা, অ্যামাজন বা নেটফ্লিক্স, পুরো বিশ্বের ডিজিটাল জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই কোম্পানিগুলো শুধু আমাদের প্রযুক্তিগত সেবাই দেয় না; বরং আমরা কী দেখব, কী কিনব এবং কী ভাবব—তার সবকিছুই তারা পর্দার আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা অনেকেই ভাবি গুগল বা ইউটিউব একদম নিরপেক্ষ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইউটিউব বা নেটফ্লিক্সের রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো থাকে, যা মূলত পশ্চিমা বা তাদের জন্য লাভজনক কনটেন্টগুলোকেই বারবার আমাদের চোখের সামনে নিয়ে আসে। আগে পশ্চিমা দেশগুলো সিনেমা বা খবরের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলত, এখন সেটা হচ্ছে ডিজিটাল কাঠামোর ভেতর দিয়ে। এই প্ল্যাটফর্ম সাম্রাজ্যবাদের একটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ডেটা পাচার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন যে পরিমাণ ডেটা তৈরি করছে, তার আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি ভোগ করছে এই টেক জায়ান্টরা। অন্যদিকে, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্থানীয় ব্যবসা বা মিডিয়াগুলোকে বাধ্য হয়ে বিদেশি কোম্পানিগুলোর তৈরি করা নিয়মের কাছেই মাথা নত করতে হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, আমাদের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, আমাদের মনোযোগ, ডেটা এবং সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণও তারই হাতে চলে যাচ্ছে। গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মগুলোর দাপটে স্থানীয় কনটেন্ট বা দেশীয় সংস্কৃতি আজ এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে একটি সাংস্কৃতিক একঘেয়েমি তৈরি হচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্বতা। অবশ্য সম্প্রতি টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম বা আঞ্চলিক কিছু স্ট্রিমিং সাইট পশ্চিমা আধিপত্যকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, যা ক্ষমতার এই কাঠামোকে আরও জটিল করে তুলছে। তারপরও, ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণের মূল সমস্যাটি থেকেই যায়। এই ডিজিটাল আগ্রাসন থেকে বাঁচতে এখন বিশ্বজুড়ে গবেষক ও সরকারগুলো নড়েচড়ে বসছেন। ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব (Digital Sovereignty), ডেটা সুরক্ষা এবং অ্যালগরিদমের স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে এখন জোর আলোচনা হচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এর বিনিময়ে আমরা আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং ডেটার নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছি কি না—সেটা গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখার সময় এখনই।

অন্ধকার অর্থের আলোয় ফেরা

“এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী এই পঙ্‌ক্তিমালা যেন আধুনিক বিশ্ব-অর্থনীতির এক নিদারুণ এবং রূঢ় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানুষের এই অন্তহীন লোভ আর অবৈধভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করার আদিম প্রবৃত্তি থেকেই মূলত জন্ম নেয় ‘ছায়া অর্থনীতি’ বা ‘কালো টাকা’। যখন রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে অগোচরে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে এবং সেই অন্ধকার অর্থ রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করতে উদ্যত হয়, তখন সেই অর্থকে মূলধারার আলোয় ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রকেই কখনো কখনো আপসের পথে হাঁটতে হয়। অনৈতিক হলেও বাস্তবতার নিরিখে করা এই কাঠামোগত আপসেরই আনুষ্ঠানিক নাম হলো ‘কালো টাকা সাদা করার নীতি’ বা ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’, যা যুগ যুগ ধরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়। কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি বিশ্ব অর্থনীতিতে সাধারণত ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’ (Tax Amnesty) বা ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার প্রোগ্রাম’ (VDP) নামে পরিচিত। এটি মূলত সরকারের এমন একটি নীতি, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবৈধ উৎস থেকে বা অপ্রদর্শিতভাবে অর্জিত অর্থ নির্দিষ্ট কর ও জরিমানাসাপেক্ষে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রকাশনা অনুযায়ী, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা, কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা এবং ছায়া অর্থনীতিকে (Shadow Economy) আনুষ্ঠানিক বা মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা। আধুনিক কর ব্যবস্থায় এই ধারণার প্রয়োগ শুরু হয় মূলত বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কর প্রশাসন (IRS) প্রথম স্বেচ্ছা ঘোষণার সুযোগ দিয়ে করদাতাদের অপরাধমূলক মামলা থেকে মুক্তির নীতি গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৫১ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫, ১৯৯৭ সালের ‘ভিডিস’ (VDIS) ও ২০১৬ সালে বিভিন্ন পর্যায়ে অপ্রদর্শিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ইউরোপের দেশ ইতালিতেও ২০০১ সালে “স্কুডো ফিসক্যালে” (Scudo Fiscale) নামে একটি বড় ট্যাক্স অ্যামনেস্টি চালু হয়, যার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কালো টাকা সাদা করার এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে করদাতা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দেশের ভেতরে বা বিদেশে থাকা তার অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদের পরিমাণ স্বেচ্ছা ঘোষণা (Voluntary Declaration) করেন। এরপর কর কর্তৃপক্ষ সেই ঘোষিত সম্পদের বাজারমূল্য যাচাই করে তার ওপর প্রযোজ্য কর ও জরিমানার হার নির্ধারণ করে। পরবর্তী ধাপে করদাতা নির্ধারিত সেই অর্থ পরিশোধ করেন, যেখানে সাধারণত জরিমানা স্বাভাবিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তুলনায় কিছুটা কম রাখা হয় যাতে মানুষ এই সুযোগ নিতে উৎসাহিত হয়। সবশেষে, সকল শর্ত পূরণের পর করদাতাকে পূর্বের কর ফাঁকির জন্য ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা থেকে আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি (Legal Immunity) দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নীতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছে। ওইসিডি (OECD)-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায় একটি বিশাল ট্যাক্স অ্যামনেস্টি প্রোগ্রাম চালু করা হয়, যেখানে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ঘোষণা করা হয় এবং সরকার প্রায় ৯.৬ বিলিয়ন ডলার কর আদায় করতে সক্ষম হয়, যা বিশ্বের অন্যতম সফল একটি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। একই বছর আর্জেন্টিনায় ‘সিনসেরামিয়েন্তো ফিসক্যাল’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলারের অঘোষিত সম্পদ মূলধারায় আসে। অন্যদিকে, ভারতের ২০১৬ সালের ইনকাম ডিক্লারেশন স্কিমে (IDS) প্রায় ৬৫,২৫০ কোটি রুপি অঘোষিত সম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয়। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রও ২০০৯ সাল থেকে অফশোর ভলান্টারি ডিসক্লোজার প্রোগ্রামের (OVDP) মাধ্যমে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি অ্যাকাউন্টে লুকানো অর্থ মূলধারায় আনতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে কর সাধারণ ক্ষমার প্রভাব দ্বিমুখী। স্বল্পমেয়াদে এটি হঠাৎ করে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়, যা বিশেষ করে অর্থনৈতিক মন্দা বা বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় সাময়িক স্বস্তি দেয় এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে একে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ (Moral Hazard) বা নৈতিক স্খলনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতিবিদ জেমস আল্ম (James Alm) এবং ডব্লিউ. বেক-এর ১৯৯০ সালের বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, ঘন ঘন ট্যাক্স অ্যামনেস্টি দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের কর দেওয়ার প্রবণতা (Tax compliance) কমে যায়। নিয়মিত ও সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন, কারণ তারা দেখতে পান যে কর ফাঁকি দিয়ে পরবর্তীতে সামান্য জরিমানা দিয়েই পার পাওয়া সম্ভব। কালো টাকা সাদা করার নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি সাময়িক দাওয়াই বা ‘কুইক ফিক্স’ হিসেবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কর শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কারণে আধুনিক বিশ্বে ওইসিডি (OECD) এবং জি-২০ ভুক্ত উন্নত দেশগুলো এখন এই ধরনের কর ক্ষমার বদলে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অফ ইনফরমেশন (AEOI), আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং তথ্য বিনিময় এবং উন্নত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধের ওপরই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করছে।

জ্ঞানতত্ত্ব বা এপিস্টেমোলজি কেন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ

তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন অসংখ্য খবর, মতামত, ভিডিও, পোস্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা তৈরি কনটেন্ট আমাদের সামনে আসছে। এই বিপুল তথ্যপ্রবাহের মধ্যে কোনটি সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর এবং কোনটি সম্পূর্ণ মিথ্যা-তা নির্ধারণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology), নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জ্ঞানতত্ত্ব মূলত জ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজে। জ্ঞান কী, মানুষ কীভাবে জ্ঞান অর্জন করে, কোন বিশ্বাসকে সত্য বলে গ্রহণ করা যায় এবং জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কোথায়—এসব বিষয় নিয়ে এই শাখা আলোচনা করে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, জ্ঞানতত্ত্ব আমাদের শেখায় কীভাবে আমরা কোনো বিষয়কে সত্য বলে জানি এবং সেই জানার ভিত্তি কতটা নির্ভরযোগ্য। একসময় জ্ঞানতত্ত্ব ছিল মূলত দার্শনিক ও একাডেমিক আলোচনার বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখার পর, সংবাদ পড়ার সময় কিংবা AI-এর কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়ার পর আমরা সচেতন বা অসচেতনভাবে সেই তথ্যের সত্যতা বিচার করার চেষ্টা করি। এই বিচার প্রক্রিয়ার পেছনেই কাজ করে জ্ঞানতাত্ত্বিক চিন্তা। জ্ঞান কীভাবে গঠিত হয়? মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন করে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, স্মৃতি এবং অন্যের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য—সবই জ্ঞানের উৎস হিসেবে কাজ করে। তবে কোনো তথ্য সম্পর্কে বিশ্বাস তৈরি হওয়া আর সেটিকে জ্ঞান হিসেবে গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। দার্শনিকদের মতে, কোনো বিশ্বাসকে জ্ঞান হিসেবে বিবেচনা করতে হলে সেটি হতে হবে সত্য, যুক্তিসঙ্গত এবং প্রমাণসমর্থিত। অর্থাৎ শুধু বিশ্বাস করলেই কোনো বিষয় জ্ঞান হয়ে যায় না; তার পক্ষে যথেষ্ট ভিত্তি থাকতে হয়। ডিজিটাল যুগে এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভুল তথ্যও অনেক সময় সত্যের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্বাস ও জ্ঞানের পার্থক্য মানুষ প্রায়ই এমন অনেক বিষয় বিশ্বাস করে যার পেছনে পর্যাপ্ত প্রমাণ থাকে না। কোনো তথ্য জনপ্রিয় হওয়া, বারবার শোনা যাওয়া বা নিজের মতাদর্শের সঙ্গে মিল থাকা মানেই সেটি সত্য নয়। জ্ঞানতত্ত্ব এই পার্থক্যটি স্পষ্ট করে। এটি দেখায় যে বিশ্বাস ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু জ্ঞানকে অবশ্যই যাচাইযোগ্য হতে হবে। তাই কোনো তথ্য গ্রহণ করার আগে তার উৎস, প্রমাণ এবং যুক্তিগত ভিত্তি পরীক্ষা করা জরুরি। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সন্দেহবাদ ও সমালোচনামূলক চিন্তার গুরুত্ব জ্ঞানতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো সন্দেহবাদ (Skepticism)। সন্দেহবাদ মানে সবকিছু অস্বীকার করা নয়; বরং কোনো দাবি গ্রহণ করার আগে তার যথার্থতা যাচাই করা। যখন আমরা কোনো তথ্য দেখি, তখন কিছু মৌলিক প্রশ্ন করা প্রয়োজন—তথ্যটির উৎস কী? এর পক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে? তথ্যটি কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে? এই ধরনের প্রশ্ন সমালোচনামূলক চিন্তার ভিত্তি তৈরি করে। সাংবাদিকতা, বিজ্ঞান, আইন এবং গবেষণার মতো ক্ষেত্রগুলোতে এই পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব ক্ষেত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করে তথ্যের যথার্থতা ও প্রমাণের ওপর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জ্ঞানতত্ত্বের নতুন বাস্তবতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি জ্ঞানতত্ত্বকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বর্তমানে AI বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, নিবন্ধ লিখতে পারে এবং জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে। তবে AI-এর দেওয়া সব তথ্য যে শতভাগ সঠিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় AI ভুল তথ্যও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। ফলে ব্যবহারকারীদের শুধু তথ্য গ্রহণ করলেই চলবে না; সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার সক্ষমতাও থাকতে হবে। এই প্রয়োজনীয়তা জ্ঞানতত্ত্বের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থায় জ্ঞানতত্ত্বের প্রভাব আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় এখন ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে ক্রিটিক্যাল থিংকিং, মিডিয়া লিটারেসি এবং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষার ধারণা। এসব দক্ষতার মূল ভিত্তি জ্ঞানতাত্ত্বিক চিন্তাধারা। শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, নির্ভরযোগ্য উৎস নির্বাচন করতে হয় এবং যুক্তির ত্রুটি শনাক্ত করতে হয়। এর ফলে তারা শুধু তথ্য মুখস্থ করার পরিবর্তে তথ্য বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের ক্ষমতা অর্জন করছে। জ্ঞান কি চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়? জ্ঞানতত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, মানবজ্ঞান সবসময় পরিবর্তনশীল এবং বিকাশমান। মানুষের স্মৃতি ভুল হতে পারে, ইন্দ্রিয় বিভ্রান্ত করতে পারে এবং নতুন তথ্যের আলোকে পুরোনো ধারণা পরিবর্তিত হতে পারে। বিজ্ঞানের ইতিহাসেও এর বহু উদাহরণ রয়েছে। একসময় যেসব তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য মনে করা হতো, নতুন গবেষণা ও প্রমাণের ভিত্তিতে সেগুলোর অনেকগুলোই সংশোধিত হয়েছে। তাই জ্ঞানকে স্থির নয়, বরং ক্রমাগত বিকাশমান একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। এই কারণেই জ্ঞানতত্ত্ব শুধু দর্শনের একটি তাত্ত্বিক শাখা নয়; বরং তথ্যসমৃদ্ধ আধুনিক সমাজে সত্য অনুসন্ধানের একটি অপরিহার্য বুদ্ধিবৃত্তিক হাতিয়ার। তথ্যের ভিড়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে, বিভ্রান্তি থেকে দূরে থাকতে এবং যুক্তিনির্ভর চিন্তা গড়ে তুলতে জ্ঞানতত্ত্বের ভূমিকা আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইতালীয় ফুটবলের ‘বিশ্বকাপহীন’ ট্র্যাজেডি ও দীর্ঘস্থায়ী এক অভিশাপের বিতর্ক

ফুটবল ইতিহাসের পাতায় ২০০৬ সালের ৯ জুলাইয়ের রাতটি যেন এক দ্বান্দ্বিক স্মৃতি। বার্লিনের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে জিনেদিন জিদানের বিদায়লগ্নের সেই বিখ্যাত ‘হেডবাট’ ও ইতালির বিশ্বকাপ জয়—ফুটবল প্রেমীদের কাছে চিরস্মরণীয়। কিন্তু সেই জয়ের উল্লাসের আড়ালে যে ইতালীয় ফুটবলের জন্য দীর্ঘ এক ‘অভিশাপ’ লুকিয়ে ছিল, তা যেন আজ দুই দশক পরে এসে আরও স্পষ্ট। চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি সেই গৌরবের শিরোপা জয়ের পর থেকেই বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে নিজেদের ছন্দ হারিয়েছে। টানা ১২ বছর বিশ্বকাপের মূল পর্বে ইতালিবিহীন থাকা আজ্জুরিদের এই বর্তমান দুর্দশা কেবল মাঠের পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি ফুটবল ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজেডি। ২০০৬ সালের সেই শ্রেষ্ঠত্বের পর থেকেই ইতালির পারফরম্যান্সে এক ভয়াবহ ধস নেমেছে। ২০১০ এবং ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে না পারা ছিল কেবল প্রারম্ভিক ব্যর্থতা। এর পরের চিত্রটি ছিল আরও করুণ; ২০১৮ এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইতালি বাছাইপর্বের গণ্ডি পেরোতেই ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে সুইডেন এবং নর্থ মেসিডোনিয়ার মতো দলের কাছে হেরে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়া চারবারের চ্যাম্পিয়নদের জন্য ছিল এক বিশাল অপমান। ফুটবল বোদ্ধারা একে ‘নতুন প্রজন্মের অভাব’ বা ‘সিরি আ-র কাঠামোগত দুর্বলতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও, ইতালীয় সমর্থকদের একাংশ একে দেখছে এক অলৌকিক নিয়তির লিখন হিসেবে। তাদের বদ্ধমূল ধারণা, জিদানকে মাঠ থেকে বিদায় করার সেই বিতর্কিত ফাইনাল জয়ের পর থেকেই ইতালীয় ফুটবলের ওপর যেন এক ধরনের অশুভ ছায়া ভর করেছে। ইতালির এই দীর্ঘ পতনের পেছনে অবশ্য গভীর কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে। ইতালীয় তরুণ প্রতিভার লালনের অভাব, রক্ষণাত্মক ফুটবল থেকে আধুনিক গতিময় আক্রমণে রূপান্তরের ধীরগতি এবং বড় টুর্নামেন্টের চরম স্নায়ুচাপ সামলাতে বর্তমান দলের অক্ষমতা আজ্জুরিদের পতনের মূল কারণ। একসময় যারা ছিল বিশ্ব ফুটবলের রক্ষণভাগের অজেয় দুর্গ, তারা এখন নিজেদের ঘরেই পথ হারিয়েছে। সিরি আ-তে বিদেশি খেলোয়াড়দের আধিপত্য ও স্থানীয় ফুটবলারদের সীমিত সুযোগ তাদের জাতীয় দলের গভীরতাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জিদানের সেই বিদায়লগ্নে পাওয়া জয়টি হয়তো ছিল ভাগ্যের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি, কিন্তু তার পরবর্তী দুই দশকের পারফরম্যান্স বলে দেয়, ইতালি তাদের ঐতিহ্যগত শৃঙ্খলা ও ফুটবলীয় দর্শনকে অনেকটাই বিসর্জন দিয়েছে। ইতালির ফুটবল ইতিহাসে বারবার ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর নজির থাকলেও, বর্তমান সময়ে বিশ্বফুটবলে ইতালি যেন এক হারিয়ে যাওয়া শক্তি। বিশ্বকাপের মাঠে ইতালির রক্ষণভাগের শৈল্পিক লড়াই ও লড়াকু মানসিকতা দর্শক আজ তীব্রভাবে অনুভব করছে। বার্লিনের সেই গৌরবময় স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে ইতালি কি পারবে নতুন কোনো রূপকল্প তৈরি করতে? নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা কি সেই পুরনো ‘অভিশাপ’ ভেঙে আজ্জুরিদের নতুন কোনো ভোরের স্বপ্ন দেখাতে পারবে? সেই উত্তরের অপেক্ষায় আছে বিশ্বজুড়ে থাকা অগণিত ফুটবল প্রেমী। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বিশ্বমঞ্চে ইতালির মতো ঐতিহ্যবাহী দলের অনুপস্থিতি সবসময়ই ফুটবলের জৌলুসকে খানিকটা হলেও ফিকে করে দেয়। ইতালির জন্য এখন সময় এসেছে রূপকথার গল্প ছেড়ে কঠোর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নতুন করে পথচলা শুরু করার।

‘রইদ’ কেন সর্বসাধারণের সিনেমা হলো না

‘রইদ’ মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় সিনেমা। রইদ-এ সিনেমার প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাজিফা তুষি। রইদ সিনেমায় নাজিফা তুষির নিজস্ব কোনো নাম ছিলো না। পুরো সিনেমায় ‘সাধুর বউ’ হিসাবে অভিনয় করেছেন এবং সিনেমা মুক্তির পরও এই নামে পরিচিতি পেয়েছেন দর্শকদের কাছে। তবে রইদ বাংলাদেশের প্রচলিত সিনেমা থেকে অনেকটা ভিন্নধর্মী। বাংলাদেশে এই ধারার সিনেমা খুব কমই তৈরি হয়েছে। তাই বিশ্লেষক, সমালোচক ও দর্শকরা নানামুখি প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। কেউ কেউ রইদ কে আর্টফিল্ম বলেও সম্মোধন করছেন। আর্ট মূলত কী? এই প্রশ্নের উত্তর যুগে যুগে অনেকে অনেক ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। আর্টের নির্দিষ্ট কোনো মানদণ্ড নেই, মানুষ নিজেরাই মূলত আর্টের অর্থ বের করে নেয় তার রস, গল্প থেকে। রইদের নির্মাতা বলতেছেন রইদ-এর আলাদা অর্থ আছে, স্বতন্ত্র গল্প আছে যা দর্শকদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। তবে আর্টফিল্মের ব্যাপারে চলচ্চিত্র সমালোচক ও শিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটা ধারণা পাওয়া যায়। মার্কিন লেখক ও চলচ্চিত্র সমালোচক জোনাথন রোজেনবাউমের মতে, “সিনেমা জগতের সঙ্গেই সম্পর্কিত, এটির বিকল্প নয়। আর আর্ট ফিল্ম বাস্তববিমুখ বিনোদন না দিয়ে দর্শকের চেনা জগৎকে নতুন চোখে দেখতে বাধ্য করে।” পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন চলচ্চিত্র সমালোচক ও চিত্রনাট্য লেখক রজার এবার্টের দৃষ্টিতে, “আমি যদি আর্ট ফিল্মকে সংজ্ঞায়িত করতে চাই, তবে তা হবে আচরণের ক্লোজ অবজারভেশনের ওপর তৈরি সিনেমা। যেখানে বুদ্ধিমত্তা ও সহমর্মিতার প্রয়োজন হয়।” রইদ দেখার পর অনেক দর্শক রইদের গল্পকে অনেক জটিল ছিলো বলে মন্তব্য করেছেন। দর্শকের মতে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রতিকী, মেটাফোর ব্যবহার করেছেন। যা দর্শকের কাছে অস্পষ্টতা তৈরি করেছে। যার ফলে মূল গল্প থেকে সাধারণ দর্শক কিছুটা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেছেন। রইদ-এ প্রধান চরিত্রে অভিনীত মোস্তাফিজুর নূর ইমরান দর্শকের একাংশের সিনেমাটি বুঝতে না পারার পেছনে সাংস্কৃতিক চর্চার অভাবকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘‌আসলে সবকিছু বুঝে ওঠার মতো মনন এখনো আমাদের দর্শকের তৈরি হয়নি। দীর্ঘ ৩০-৩২ বছর ধরে লোকচর্চার যে অভাব, তাতে আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির অনেক কিছুই তো নষ্ট হয়ে গেছে। তবে রইদের মধ্য দিয়ে একটা নতুন ট্রেন্ড সেট হলো, যা আগামীতে অন্যরা অনুসরণ করবে।’ রইদ-এর গল্প পরিচালক মেজবাউর সুমন তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলে গেছেন। কিছু ক্ষেত্রে গল্পের সরাসরি উত্তর না দিয়ে দর্শকদের ব্যাখ্যার উপর ছেড়ে দিয়েছেন। গল্পের মধ্যে ‘একশন, আইটেম গান, ফাইটিং, আবেগের আতিশয্য নেই। যা মূলত এই অঞ্চলের মানুষ সিনেমাতে দেখে অভ্যস্ত। মূলত বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোতে এইসব উপাদানগুলো দেখা যায়। বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আয়কারী দশটি সিনেমার মধ্যে প্রথম পাঁচটি সিনেমা- বরবাদ, তুফান, প্রিয়তমা, তান্ডব, রাজকুমার। এই সবগুলোতেই ‘একশন, ফাইটিং, স্টারডম, গ্লামার, রোমান্স, আইটেম গান, আবেগের রেষ, উপাদানগুলো বিদ্যমান। সেক্ষেত্রে রইদ যে ভিন্ন ধারার সিনেমা এবং সেটা যে বিভিন্ন মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে সেটাকে বিভিন্ন মহল সাধুবাদ জানাচ্ছে। রইদ দেখে অনেক সাধারণ দর্শক গল্প না বুঝার পিছনের কারণগুলো হতে পারে, মিকেল এঞ্জেলোর পেইন্টিং, ক্রিয়েশন অফ এডাম, ইভ আর লিলিথ, ইডেন গার্ডেন, বুদ্ধ ধর্মের শামশারা, এস এম সুলতানের ছবির গ্রাম, নোয়াস আর্ক এসব সম্পর্কে সবার সমান জানাশোনা না থাকা। তবে রইদ সিনেমার সাউন্ড কোয়ালিটির মান, সিনেমেটোগ্রাফির শর্ট, ভিজ্যুয়াল এফেক্ট অনেকটা দারুণ ছিলো বলে প্রায় সকল দর্শক মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে রইদ-এর গল্প মূলত পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন গল্পগুলোকে নানান স্তরে দেখানের চেষ্টা করেছে। সেগুলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তুলে আনার চেষ্টা করেছে। যেমন- ‘গন্ধম’ ফলের বিকল্প তালকে সামনে এনেছেন। এই অঞ্চলের মানুষের জীবনযাপনের উপর ভিত্তি করে তৈরি করেছেন। তবে এখানে উল্লেখ্য একটা বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ সিনেমায় গল্পের উপসংহার থাকে কিন্তু রইদের নেই। রইদ উল্টো উত্তর না দিয়ে অনেক অনেক প্রশ্ন তৈরি করে। সেইসব প্রশ্নের উত্তর নেই, দর্শক নিজের মতো করে উত্তর খুঁজে নেওয়ার উপর ছেড়ে দিয়েছে। পাশাপাশি রইদ অনেক জায়গায় বিবলিক্যাল মেটাফোর ব্যবহার করেছে। গল্পের প্রয়োজনেই সেসব মেটাফোর ব্যবহার করেছে। তবে মেটাফোরগুলো ধরতে পারলে দর্শকদের জন্য সরল গল্পটা অনেক উপভোগ্য হতে পারে। সব বিবেচনা করে রইদ ভিন্নধর্মী সিনেমা হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত সিনেপ্লেক্সে, হলগুলোতে সমানতালে প্রাসঙ্গিক হওয়া প্রমাণ করে রইদ-এর আলো ধীরে ধীরে দর্শকদের কাছে ঠিকই পৌঁছাচ্ছে।

মানুষ কি টাকা তুলছে, নাকি আস্থা সরিয়ে নিচ্ছে?

ব্যাংকিং খাতে একটি পুরোনো সত্য আছে। ব্যাংক ভাঙে টাকা শেষ হয়ে গেলে নয়, ভাঙে যখন মানুষের বিশ্বাস শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে গত পাঁচ কর্মদিবসে ৩,৫০০ কোটিরও বেশি টাকা উত্তোলনের ঘটনা সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনে দিয়েছে। ঘটনাটি কেবল একটি ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পরিসংখ্যান নয়; এটি আমানতকারীদের আস্থা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের একটি বড় সংকেত। নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পরপরই ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ, কর্মসূচি এবং পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চেয়ারম্যানের প্রথম কার্যদিবসের বোর্ড সভা সরাসরি নয়, অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। এরপরই শুরু হয় আরেক ধরনের ভোট ,নীরব ভোট। এই ভোট ব্যালট বাক্সে নয়, ব্যাংকের কাউন্টারে দেওয়া হয়।গ্রাহকরা প্রতিবাদ মিছিলে না গিয়েও নিজেদের অবস্থান জানাতে শুরু করেন টাকা তুলে নেওয়ার মাধ্যমে। মাত্র চার কর্মদিবসে প্রায় ২,৫৭০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী একদিনে আরও প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা উত্তোলিত হয়। মোট পরিমাণ ৩,৫০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন, একজন আমানতকারী যখন টাকা জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু টাকা নয়, বিশ্বাসও জমা রাখেন। আর যখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তখন মানুষ প্রথমেই নিজের সঞ্চয় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে চায়।ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহেও সেই মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেউই এখনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে। অর্থাৎ সংকটটি আপাতত অর্থের ঘাটতির নয়, বরং আস্থার ঘাটতির। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যাংকটি গত এক বছরে আমানত বৃদ্ধির দিক থেকে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটিরও বেশি নতুন আমানত যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ যে ব্যাংকে মানুষ নতুন করে টাকা রাখতে শুরু করেছিল, সেই ব্যাংক থেকেই এখন মানুষ দ্রুত টাকা সরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণেই ৩,৫০০ কোটি টাকার এই উত্তোলনকে শুধু আর্থিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি “Confidence Test”। মানুষ কি ব্যাংকের নেতৃত্বে আস্থা রাখছে? মানুষ কি মনে করছে তাদের সঞ্চয় নিরাপদ? মানুষ কি বিশ্বাস করছে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন নির্ধারণ করবে ইসলামী ব্যাংকের পরবর্তী পথচলা। ইতিহাস বলে, ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনের শুরু হয় সাধারণত গুজব থেকে; কিন্তু সেই গুজব যদি আস্থার সংকটের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে সেটি দ্রুত ব্যাংক রান (Bank Run)-এর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই পর্যায়ে বলতে নারাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, তবুও কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন বাজারে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই… ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি তারল্য সংকট, নাকি বিশ্বাস পুনর্গঠন? কারণ ব্যাংকিং জগতে টাকা হারালে তা ফেরত আনা যায়; কিন্তু বিশ্বাস হারালে সেটি ফিরিয়ে আনতে কখনো কখনো বছরের পর বছর লেগে যায়।

একটি হেডবাট, এক বিশ্বকাপ, এক কিংবদন্তির বিতর্কিত বিদায়

ফুটবল ইতিহাসে খুব কম মুহূর্তই আছে যা ২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ফরাসি অধিনায়ক জিনেদিন জিদান এবং ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার মতো এত বিতর্ক, আবেগ এবং দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০০৬ সালের ৯ জুলাই, বার্লিনের অলিম্পিয়াস্টাডিয়নে বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী জড়ো হয়েছিল এমন এক মুহূর্তের সাক্ষী হতে, যা অনেকের ধারণা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের গৌরবময় বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখবে। কিন্তু সেই ম্যাচ শেষ পর্যন্ত জন্ম দেয় এমন একটি দৃশ্যের, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ফ্রান্স ও ইতালির মধ্যে স্কোর ছিল ১-১। পেনাল্টি শুটআউটের সম্ভাবনা সামনে রেখে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে, আর মাঠের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক তখনই ঘটে সেই ঘটনা, যা বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শককে স্তম্ভিত করে দেয়। হঠাৎ করেই জিদান ঘুরে দাঁড়িয়ে মাতেরাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে আঘাত করেন। ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, আর পুরো স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময় ও বিভ্রান্তি। কিছুক্ষণ পর ম্যাচ কর্মকর্তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে জিদানকে লাল কার্ড দেখানো হয়। এটাই ছিল তার বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। লাল কার্ড পাওয়ার পর যখন জিদান ধীরে ধীরে মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমের দিকে হাঁটছিলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছিল ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রতীকী এক দৃশ্য—একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড় ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তা বিজয়ের উল্লাসে নয়; বরং বিতর্কের আবহে। বহু বছর ধরে এই প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল—মাতেরাজ্জি ঠিক কী বলেছিলেন, যা জিদানকে এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করেছিল? পরবর্তীতে দুই খেলোয়াড়ের বক্তব্য থেকে ঘটনার কিছুটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। মাতেরাজ্জি স্বীকার করেন যে তিনি কথোপকথনের সময় জিদানের বোনকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। পরে তিনি সেই মন্তব্যকে “বোকামিপূর্ণ” বলে উল্লেখ করেন, যদিও তার দাবি ছিল এমন মন্তব্য কখনোই শারীরিক আক্রমণের কারণ হতে পারে না। অন্যদিকে জিদানের ব্যাখ্যা ছিল ভিন্ন। ফরাসি কিংবদন্তি জানান, তার পরিবার—বিশেষ করে তার মা ও বোনকে নিয়ে করা অপমানজনক মন্তব্য তার ব্যক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করেছিল। তিনি বলেন, এমন মন্তব্য তাকে শারীরিক সংঘর্ষের চেয়েও বেশি আঘাত করেছিল। ফলে ঘটনাটি শুধুমাত্র একটি ফুটবল বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সম্মান, মর্যাদা এবং আবেগের সীমা নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার জন্ম দেয়। ফুটবলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই লাল কার্ড ফ্রান্সের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। জিদান ইতোমধ্যেই পেনাল্টি থেকে দলের হয়ে গোল করেছিলেন এবং পুরো দলের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় ছিলেন। ম্যাচের শেষ মুহূর্তে তার অনুপস্থিতি ফ্রান্সকে তাদের নেতা, সবচেয়ে অভিজ্ঞ পেনাল্টি শুটার এবং মানসিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়কে হারানোর সমান ছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে, যেখানে ইতালি ৫-৩ ব্যবধানে জয়ী হয়ে নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত করে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, জিদান যদি মাঠে থাকতেন, তাহলে ফলাফল ভিন্নও হতে পারত। যদিও এ ধরনের আলোচনা অনুমানের পর্যায়ে পড়ে, তবে এ বিষয়ে খুব কমই দ্বিমত রয়েছে যে অধিনায়কের বিদায় ফ্রান্সকে বড় ধরনের অসুবিধায় ফেলেছিল। প্রায় দুই দশক পরও এই ঘটনাকে ঘিরে মতভেদ রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল একজন মহান খেলোয়াড়ের ক্ষণিকের আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা, যা তার অসাধারণ ক্যারিয়ারের ওপর একটি বিতর্কিত ছাপ ফেলে দিয়েছে। তাদের যুক্তি, পরিস্থিতি যতই উত্তেজনাপূর্ণ হোক না কেন, জিদানের মতো একজন খেলোয়াড়ের উচিত ছিল বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল ম্যাচে নিজের সংযম ধরে রাখা। অন্যদিকে অনেকেই ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তাদের মতে, এটি কেবল হতাশা বা রাগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং পরিবারের প্রতি করা অপমানজনক মন্তব্যের বিরুদ্ধে আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া ছিল। এই দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয় যে বিশ্বসেরা ক্রীড়াবিদরাও শেষ পর্যন্ত মানুষ, এবং মানুষের মতো তারাও আবেগের সীমায় পৌঁছাতে পারেন। এ কারণেই ঘটনাটি আজও আলোচনায় রয়েছে। এটি পেশাদার দায়িত্ববোধ এবং ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এই দুই আদর্শের সংঘর্ষকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল শুধু ইতালির শিরোপা জয়ের জন্য স্মরণীয় নয়; এটি স্মরণীয় কারণ ম্যাচটি বিশ্বকে দেখিয়েছিল এলিট পর্যায়ের খেলাধুলার মানবিক দিকটিও। জিদানের ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কোনো বিজয়সূচক গোল বা ট্রফি উঁচিয়ে ধরার মুহূর্ত দিয়ে শেষ হয়নি। বরং শেষ হয়েছিল এমন এক ঘটনায়, যা আজও ফুটবল সমর্থকদের মধ্যে বিতর্ক, বিশ্লেষণ এবং আবেগের জন্ম দেয়। এটিকে কেউ ক্ষমার অযোগ্য ভুল হিসেবে দেখেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত অপমানের বিরুদ্ধে স্বাভাবিক মানবিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু ব্যাখ্যা যাই হোক, ঘটনাটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে থাকবে। প্রায় বিশ বছর পরও সেই দৃশ্যটি ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে লাল কার্ড দেখার পর বিশ্বকাপ ট্রফির পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন জিনেদিন জিদান। এটি এমন এক বিদায়ের প্রতীক, যা শুধু সাফল্য ও প্রতিভার গল্প নয়; বরং মানবিক আবেগ, ব্যক্তিগত মূল্যবোধ এবং পেশাদার প্রতিযোগিতার জটিল সম্পর্কেরও এক চিরস্থায়ী স্মারক।

ফার্মেসি খাতে কর্পোরেট পুঁজির উত্থান: আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নাকি ক্ষুদ্র ব্যবসার অস্তিত্ব সংকট?

বাংলাদেশের ফার্মেসি খাতে এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই খাত মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এই বাজারে প্রবেশ করছে। কেউ এই পরিবর্তনকে স্বাস্থ্যসেবা খাতের আধুনিকায়ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সংকটের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান IQVIA-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওষুধ বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বাজারকে ঘিরে এখন বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রবণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো আকিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান AKIJ Pharmacy। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে আউটলেট চালু করেছে এবং আগামী কয়েক বছরে ব্যাপক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কয়েক হাজার ফার্মেসি আউটলেট গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। শুধু আকিজ নয়, AKS Pharmacy-ও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ৬০টির বেশি আউটলেট পরিচালনা করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগও আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে BRAC Healthcare এমন একটি মডেল চালু করেছে যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক সেবা এবং ফার্মেসি একই প্ল্যাটফর্মের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক চেইন Aster Pharmacy বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করেছে। ফলে দেশের ফার্মেসি বাজারে এখন শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আগ্রাসী সম্প্রসারণের পেছনে শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের হাতে রয়েছে বিপুল মূলধন, উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ব্যাপক বিপণন সক্ষমতা। তারা চাইলে একই সময়ে শত শত আউটলেট চালু করতে পারে, দীর্ঘ সময় কম মুনাফায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে এবং বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে পারে। অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ স্থানীয় ফার্মেসি পরিচালিত হয় সীমিত মূলধনের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা কিংবা একটি পরিবারই ব্যবসার প্রধান ভরসা। তাদের পক্ষে বড় পরিসরে ওষুধ মজুদ রাখা, আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা, নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করা কিংবা বড় আকারে প্রচারণা চালানো সহজ নয়। ফলে একই বাজারে কর্পোরেট চেইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে কর্পোরেট চেইনগুলোর উত্থানের পেছনে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নয়, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত একটি বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ফার্মেসি খাতে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের অভাব, ওষুধ সংরক্ষণের দুর্বল ব্যবস্থা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট চেইনগুলো নিজেদেরকে “নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য” বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন রেকর্ড, কোল্ড-চেইন মেইনটেন্যান্স, সরাসরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওষুধ সংগ্রহ এবং মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অর্থাৎ তারা শুধু ওষুধ বিক্রি করছে না; তারা একটি নতুন ধারণা বিক্রি করছে, যা সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ফার্মেসি ব্যবস্থার ধারণা। এখানেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রতিযোগিতা শুধু মূলধনের নয়; এটি এখন গ্রাহকের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতাও। যদি সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে কর্পোরেট চেইনই নিরাপদ ওষুধ পাওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম, তাহলে স্থানীয় ফার্মেসিগুলো ক্রমেই বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। বড় চেইন ফার্মেসিগুলো বাজারে প্রবেশের পর গ্রাহকরা সাধারণত উন্নত পরিবেশ, দীর্ঘ সময় সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং কখনও কম দামের সুবিধা পান। কিন্তু একই সঙ্গে বহু ছোট ব্যবসা ধীরে ধীরে বাজার থেকে ছিটকে পড়ে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বাংলাদেশেও এখন সেই প্রশ্ন সামনে আসছে। যদি আগামী দশকে দেশের প্রধান শহরগুলোর ফার্মেসি বাজার কয়েকটি বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবস্থান কী হবে? যারা বছরের পর বছর নিজেদের সঞ্চয়, শ্রম এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে এই খাত গড়ে তুলেছেন, তারা কি একইভাবে টিকে থাকতে পারবেন? কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ফার্মেসির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। কর্পোরেট চেইনগুলোর সম্প্রসারণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মচারীর জন্য অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে বাজারের ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এই গল্পের আরেকটি দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও উপশহর অঞ্চলে এখনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক আস্থা এবং মানবিক সেবার মূল্য অনেক বেশি। স্থানীয় ফার্মেসিগুলো অনেক সময় বাকিতে ওষুধ দেয়, জরুরি প্রয়োজনে বাড়িতে পৌঁছে দেয় এবং দীর্ঘদিনের পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে। এই সামাজিক পুঁজির সঙ্গে কর্পোরেট মূলধনের সরাসরি প্রতিযোগিতা সবসময় সহজ নয়। ফলে বাংলাদেশের ফার্মেসি খাতের সামনে মূল প্রশ্নটি শুধু কর্পোরেট বনাম ক্ষুদ্র ব্যবসা নয়। প্রশ্ন হলো কীভাবে আধুনিক, নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে, একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা যাবে। আগামী কয়েক বছরে এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ফার্মেসি খাত কোন পথে এগোবে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পথে, নাকি বাজারের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণের দিকে।

 বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতিতে এত দল কেন?

একটি প্রশ্ন, শত উত্তর। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে এমন একটি দৃশ্য দেখা গেল, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ পর্যবেক্ষকদের একইভাবে বিস্মিত করেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে মোট ৪৪টি সক্রিয় রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ১৩টি ইসলামপন্থী দল ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।  জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোট নামের এই দীর্ঘ তালিকা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে: একটিমাত্র ধর্মের নামে, মাত্র একটি দেশে, এত বিভক্ত রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব হলো কীভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল বর্তমান রাজনীতির দিকে তাকালে চলবে না। এই বিভক্তির বীজ ছড়িয়ে আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার গ্রামের মাটিতে, ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষত এবং মুসলিম পরিচয়ের সংকটে, পাকিস্তান আন্দোলনের আদর্শিক তর্কে এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতিতে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানী আলি রিয়াজের ভাষায়, “বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতি কখনো একক বা একজাতীয় ছিল না এটি সবসময়ই বহুস্তরীয় এবং প্রতিযোগিতামূলক।এই নিবন্ধটি সেই বহুস্তরীয় ইতিহাসকে পুনর্নির্মাণের একটি প্রচেষ্টা। ঔপনিবেশিক শাসন ও মুসলমানের পতন ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর বাংলার মুসলমান সমাজ এক গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের মুখোমুখি হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমান শাসকশ্রেণির হাত থেকে ক্ষমতা, ভূমি এবং প্রশাসনিক পদ একে একে চলে যায় হিন্দু মধ্যবিত্ত ও ব্রিটিশ নিযুক্ত আমলাদের কাছে। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে শুরু করে মডার্ন ইন্ডিয়া বিশেষজ্ঞ পার্থ চ্যাটার্জি পর্যন্ত সকলেই এই পতনের ব্যাপ্তিকে স্বীকার করেছেন। ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পর গ্রামাঞ্চলের মুসলমান কৃষক সমাজের উপর হিন্দু জমিদার ও ব্রিটিশ ইন্ডিগো চাষীদের শোষণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই পটভূমিতেই উদ্ভব হয় বাংলার প্রথম সংগঠিত ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের। ফরায়েজী আন্দোলন: ১৮১৮ সালে ফরিদপুরের হাজী শরীয়তউল্লাহ ফরায়েজী আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। আন্দোলনটির লক্ষ্য ছিল ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব বা ফরজ পালনের উপর জোর দিয়ে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে ইসলামী চর্চার পুনরুজ্জীবন ঘটানো এবং অনৈসলামিক প্রথা দূর করা। মক্কায় দীর্ঘ অধ্যয়নের পর দেশে ফিরে শরীয়তউল্লাহ বাংলার মুসলমান কৃষকদের দুর্দশা এবং ধর্মীয় বিচ্যুতি দেখে মর্মাহত হন।  তাঁর সংস্কার কার্যক্রম ছিল মূলত পীর ও মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলামের বিরুদ্ধে  যা বাংলার সুফি ধারার সাথে তাঁর মৌলিক বিরোধ তৈরি করে। তাঁর পুত্র দুদু মিয়ার নেতৃত্বে আন্দোলনটি আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নেয় ঔপনিবেশিক করব্যবস্থা, জমিদারী শোষণ এবং ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সাথে জমিদারদের আঁতাতের বিরুদ্ধে গণ-প্রতিরোধ হিসেবে বিকশিত হয়। ফরায়েজী আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই: এটি প্রথমবারের মতো বাংলার মুসলমান সমাজকে দুটি ধারায় বিভক্ত করে একদিকে সংস্কারবাদী বা ‘শুদ্ধবাদী’ ইসলাম, অন্যদিকে সুফি ও পীরকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ইসলাম। এই বিভাজন আজও বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির অন্তর্গত বিরোধের একটি মূল উৎস। একই সময়ে তিতুমীরের নেতৃত্বে ওয়াহাবি ধারার আন্দোলন আরেকটি পৃথক ধারা তৈরি করে। ফরায়েজী ও ওয়াহাবি উভয়ই সংস্কারবাদী হলেও তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি, সামাজিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য ছিল। এই প্রারম্ভিক বিভাজন পরবর্তী সকল বিভক্তির একটি আদিরূপ। পীর ও তরিকতের প্রভাব বাংলার ইসলামী রাজনীতিকে বুঝতে হলে সুফি তরিকা ও পীর-মুরিদ সম্পর্কের সামাজিক শক্তিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। ঐতিহাসিক অধ্যাপক আযীযুর রহমান মল্লিক তাঁর ‘British Policy and the Muslims in Bengal’গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, বাংলায় ইসলামের প্রসার হয়েছিল মূলত সুফি শায়খদের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়। ফলে মুরিদদের উপর পীরের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব গ্রামীণ সমাজে এত গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছিল যে, যেকোনো ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনকে এই কাঠামোর সাথে লড়াই করেই এগোতে হয়েছে। পীরকেন্দ্রিক রাজনীতির এই উত্তরাধিকারই পরবর্তীকালে চরমোনাই পীর, আটরশি পীর এবং অন্যান্য দরগাহকেন্দ্রিক পৃথক রাজনৈতিক সংগঠনের জন্ম দেবে। আলিগড় আন্দোলন ও বাংলার মুসলমান উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলন মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে ব্রিটিশ শাসনের সাথে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানায়। বাংলায় এর প্রভাব পড়েছিল শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে। কিন্তু বাংলার মুসলমানদের বৃহত্তর অংশ কৃষক, মাদ্রাসাশিক্ষিত আলেম, এবং পীরের মুরিদ এই সংস্কারধারার সাথে সম্পর্কিত অনুভব করেননি। ফলে শুরু থেকেই বাংলার ইসলামী আন্দোলনে একটি শ্রেণিগত ও শিক্ষাগত বিভাজন বিদ্যমান ছিল। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও মুসলিম রাজনীতির উদ্ভব  ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা বাংলার মুসলমানদের একটি বড় অংশের কাছে স্বাগত হয়েছিল, কারণ নতুন পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন এবং ঢাকা হলো নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লিগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। কিন্তু মুসলিম লিগও কখনো একক ও অখণ্ড ছিল না। একদিকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত, পাশ্চাত্যশিক্ষিত আলিগড়পন্থী নেতৃবৃন্দ, অন্যদিকে পূর্ববাংলার কৃষক সমাজ এবং দেওবন্দি আলেমদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ছিল ভিন্ন। ঐতিহাসিক হাসান নূরুল এই বিভাজনকে “ইসলামী রাজনীতির দুই নদীর মোহানা” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একটি ধারা ছিল আধুনিক, জাতি-রাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম পরিচয়কে কেন্দ্র করে, অন্যটি ছিল ধর্মীয় আইন ও খেলাফত-ভিত্তিক ইসলামী রাষ্ট্রের স্বপ্নে আবদ্ধ। খেলাফত আন্দোলন ও তার পরিণতি ১৯১৯-২৪ সালের খেলাফত আন্দোলন বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এক বিশাল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জাগরণ এনেছিল। ইসলামী বিশ্বের খলিফার সুরক্ষার দাবিতে মুসলমান ও হিন্দু এক মঞ্চে এলেও, তুরস্কে খেলাফতের বিলোপের পর এই আন্দোলন ভেঙে পড়ে। এর পরিণতি হয় মুসলিম রাজনীতির আরও বেশি বিভক্তি কেউ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ফেরেন, কেউ কেবল ধর্মীয় পুনর্জাগরণে মনোনিবেশ করেন, আর কেউ সশস্ত্র প্রতিরোধের পথে যান। জামায়াতে ইসলামীর জন্ম ও মওদূদীর আদর্শ ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ ভারতে মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদী কর্তৃক জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার আট দশক দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। মওদূদীর ইসলামী রাষ্ট্রের ধারণা  যেখানে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা ‘হাকিমিয়্যাহ’-র ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা হবে ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দি ও সুফি ধারার সাথে কখনো পুরোপুরি মেলেনি। কওমি-ভিত্তিক ইসলামপন্থী নেতারা যুক্তি দেন যে জামায়াতের ধর্মতাত্ত্বিক অভিমুখিতা তাদের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন মওদূদীর নবী ও সাহাবীদের বিষয়ে কিছু অভিমত তারা বিধর্মী বলে মনে করেন। এই ধর্মতাত্ত্বিক বিভাজন পরবর্তীকালে রাজনৈতিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে বারবার বাধা তৈরি করেছে। পাকিস্তান আন্দোলনে জামায়াত সমর্থন দেয়নি, কারণ মওদূদী মনে করতেন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান ইসলামী রাষ্ট্রের আদর্শ পূরণ করতে পারবে না। এই অবস্থান জামায়াতকে মুসলিম লিগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতার ক্ষেত্রে তাদের আদর্শিক ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।   পূর্ব পাকিস্তানে ইসলামী রাজনীতি: দ্বন্দ্বময় পরিচয় ১৯৪৭-৭১ সালের পাকিস্তান যুগে পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সমাজে একটি গভীর পরিচয়সংকট দেখা দেয়। প্রশ্নটি ছিল: তারা কি প্রথমে বাঙালি, নাকি প্রথমে মুসলমান? ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এই সংকটকে রাজনৈতিক রূপ দেয়। রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে বাঙালি মুসলমানরা ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। রাজনীতিবিজ্ঞানী মোহাম্মদ আলী তাঁর Bengali Muslims and the Language Movement গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ভাষা আন্দোলন কেবল সাংস্কৃতিক দাবি ছিল না  এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী রাজনীতির একটি নতুন সংজ্ঞার সন্ধান। এই সময় আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসার মধ্যে বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়। সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা ক্রমশ পাকিস্তানপন্থী অভিজাত শ্রেণির সাথে যুক্ত হয়, আর স্বতন্ত্র অর্থায়নে পরিচালিত কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের বলয়

AI বাংলাদেশের যে চাকরিগুলো খেতে পারবে না

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI নিয়ে আজকাল অনেক আলোচনা। কেউ বলছেন, AI ডাক্তারদের জায়গা নেবে। কেউ বলছেন, আইনজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ কারও চাকরিই নিরাপদ নয়। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতিতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণও আছে। কারণ AI ইতোমধ্যে ছবি আঁকছে, কোড লিখছে, রিপোর্ট তৈরি করছে, এমনকি মানুষের মতো কথাও বলছে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, কিছু পেশা আছে যেগুলো AI কোনোদিনই নিতে পারবে না। কারণ এসব পেশার মূল শক্তি দক্ষতা নয়, তথ্য নয়, এমনকি যুক্তিও নয়। এগুলোর ভিত্তি হলো সম্পর্ক, অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, আর সিস্টেমের ফাঁকফোকর সম্পর্কে গভীর জ্ঞান। ধরুন, একজন বিবাহবিচ্ছেদ-অফিসের দালাল। AI হয়তো আপনাকে আইনের ধারা বুঝিয়ে দিতে পারবে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা দিতে পারবে, এমনকি আবেদনপত্রও পূরণ করে দিতে পারবে। কিন্তু AI কখনো সেই ভদ্রলোক হতে পারবে না, যিনি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন, “ভাই, প্রথমবার আসছেন মনে হয়? আমারে দেন, সব আমি করে দিচ্ছি।” এটা শুধু তথ্যের ব্যাপার নয়। এটা মানুষের অনিশ্চয়তা, ভয় এবং অস্থিরতাকে বুঝে সেখানে জায়গা করে নেওয়ার এক বিশেষ সামাজিক দক্ষতা। একই কথা প্রযোজ্য পাসপোর্ট অফিসের দালালের ক্ষেত্রেও। আদর্শ পৃথিবীতে AI-ই যথেষ্ট হওয়ার কথা। অনলাইনে আবেদন, ডিজিটাল যাচাই, স্বয়ংক্রিয় প্রসেসিং সবই সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশি বাস্তবতায় মানুষের প্রথম প্রশ্ন প্রায়ই হয়, “ভাই, শর্টকাট কোনো উপায় আছে?” AI-এর সমস্যা হলো, সে নিয়ম মেনে চলে। আর আমাদের অনেক প্রতিষ্ঠান এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে নিয়ম জানার চেয়ে “কাকে চেনেন” প্রশ্নটা কখনো কখনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হাসপাতালের দালালদের কথাও ভাবুন। একজন রোগীর পরিবার যখন আতঙ্কিত, বিভ্রান্ত এবং অসহায়, তখন AI হয়তো তথ্য দিতে পারবে। কিন্তু সেই সুযোগে কে কোথায় নিয়ে যাবে, কোন টেস্ট করাবে, কোন কেবিনে ভর্তি করাবে এই পুরো অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ হওয়া AI-এর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ AI অ্যালগরিদম বোঝে, কিন্তু “ব্যবস্থা করে দেওয়া” নামক সাংস্কৃতিক ধারণাটা বোঝে না। মজার বিষয় হলো, প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, ততই আমরা বুঝতে পারছি যে মানুষের কিছু আচরণ প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক। সেখানে দক্ষতার চেয়ে সম্পর্ক বেশি মূল্যবান, আর নিয়মের চেয়ে অনিয়ম বেশি কার্যকর। তাই AI হয়তো একদিন আমাদের জন্য প্রবন্ধ লিখবে, গাড়ি চালাবে, রোগ নির্ণয় করবে, আদালতের নথি বিশ্লেষণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের কিছু পেশা এখনো নিরাপদ। কারণ সেগুলো কোনো চাকরি নয়; সেগুলো আসলে একটি সমান্তরাল প্রতিষ্ঠান। এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী AI-ও সম্ভবত এখনো শিখে উঠতে পারেনি, কীভাবে কারও কাঁধে হাত রেখে বলতে হয়, “ভাই, চিন্তা করেন না। আমার লোক আছে।”