ককরোচ জনতা পার্টি কী? যুবকদের ক্ষোভের ভাইরাল মুভমেন্টের পুরো ঘটনা

সম্প্রতি ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা অদ্ভুত কিন্তু খুব শক্তিশালী নামের মুভমেন্ট ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল, Cockroach Janta Party বা সংক্ষেপে CJP। নামটা শুনলে প্রথমে হাসি পেলেও, এর পিছনে লুকিয়ে আছে আজকের ভারতের লক্ষ লক্ষ যুবকের গভীর ক্ষোভ, হতাশা আর প্রতিবাদ। মাত্র ৭-১০ দিনের মধ্যে এই মুভমেন্টটা এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল যে সরকারকেও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। সবকিছুর শুরু হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এর একটা মন্তব্য থেকে। একটি মামলার শুনানিতে তিনি কয়েকজন যুবককে “Cockroaches” বলে সম্বোধন করেন। এই কথাটা অনেক যুবকের কাছে খুবই অপমানজনক লেগেছে। তারা মনে করেছে, তাদের বেকারত্ব, হতাশা আর সংগ্রামকে এভাবে অপমান করা হয়েছে। ঠিক এই সময়ে বোস্টনে বসবাসকারী ৩০ বছর বয়সী তরুণ অভিজিৎ দিপকে এই ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে Cockroach Janta Party নামে একটা ওয়েবসাইট আর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলেন। তিনি নিজেকে এই মুভমেন্টের ফাউন্ডার হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বলেন, এটা “অলস ও বেকার যুবকদের কণ্ঠস্বর”। তাদের পোস্টগুলো ছিল একদম অন্যরকম। তীব্র ব্যঙ্গ, মজার মিম, আর সরাসরি সরকার ও প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা। NEET পেপার লিক, চাকরির পরীক্ষায় অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা, বেকারত্বের সমস্যা ইত্যাদি ইস্যুতে তারা এমনভাবে কথা বলছিল যে যুবকরা দলে দলে যোগ দিতে শুরু করে। ইনস্টাগ্রামে মাত্র কয়েকদিনেই তাদের ফলোয়ার সংখ্যা ২ কোটিরও বেশি হয়ে যায়। তাদের ম্যানিফেস্টোতে বেশ কিছু স্পষ্ট দাবি ছিল। যেমন : জজদের পোস্ট-রিটায়ারমেন্ট সুবিধা বন্ধ করা, নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ রিজার্ভেশন, স্বাধীন মিডিয়ার পক্ষে কথা বলা, রাজনৈতিক নেতাদের দলবদলের উপর ২০ বছরের নিষেধাজ্ঞা, আর NEET-এর মতো পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি। এসব দাবি যুব সমাজের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। কিন্তু এই দ্রুত উত্থান সরকারের পছন্দ হয়নি। হঠাৎ করেই তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ব্লক করে দেওয়া হয় এবং X (টুইটার) অ্যাকাউন্টও বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে এটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং Intelligence Bureau-এর রিপোর্টের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিজিৎ দিপকে জানিয়েছেন, তিনি ও তার পরিবারকে মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। এখন তিনি দিল্লি হাইকোর্টে অ্যাকাউন্ট আনব্লক করার জন্য মামলা করেছেন। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে দুই দিক থেকে। বিজেপি এই মুভমেন্টকে “বিদেশি ষড়যন্ত্র” এবং “বিরোধীদের মদদপুষ্ট” বলে আক্রমণ করেছে। তারা বলছে, এটা দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার চেষ্টা। অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর বলেছেন, গণতন্ত্রে ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনা আর যুবকদের ক্ষোভ প্রকাশের জায়গা থাকা উচিত। তিনি এই ক্ষোভকে সঠিক চ্যানেলে নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। আসলে Cockroach Janta Party কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। এটা কোনো নির্বাচনে লড়বে না। এটা শুধুমাত্র যুবকদের জমে থাকা দীর্ঘদিনের হতাশা আর রাগের একটা ব্যঙ্গাত্মক প্রকাশ। কিন্তু এর এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এবং সরকারের এত তাড়াতাড়ি দমন করা। দুটো ঘটনাই আজকের ভারতে যুব সমাজের অবস্থা এবং ডিজিটাল রাজনীতির বাস্তবতা কতটা সংবেদনশীল তা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
শিষ্টাচারহীন এনসিপি নাকি প্রশ্নবিদ্ধ বিএনপির আচরণবিধি

সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কের স্পষ্ট টানাপোড়ন এখন ক্রমশই অস্বস্তিকর বাকযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে।এনসিপির সাম্প্রতিক আচরণ ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা ।পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন: “এনসিপির আচরণে শিষ্টাচার, ভদ্রতা কিংবা রাজনৈতিক সৌজন্যের বালাই নেই”। এমনকি বিএনপি নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এর কটাক্ষ মন্তব্য ছিল এমন , “এনসিপির নেতা-কর্মীদের আচরণ দেখে মনে হয় তারা এমন কিছু সেবন করেন যাতে তাদের আচরণ স্বাভাবিকতার সীমা অতিক্রম করছে।” মন্তব্যের এমন পাল্টাপাল্টি ঝড় সংসদের টেবিল থেকে এখন জনগণের সোশ্যাল মিডিয়ার টাইমলাইনে এসে উঠেছে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে গুরুতর অভিযোগ তুলে বলেছেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নাকি সচিবের স্বাক্ষর ছাড়াই ফাইল পাস করানোর চেষ্টা করতেন।আসিফ মাহমুদ সময় নষ্ট না করে সরাসরি ফেসবুকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন: তিনি বলেন, অভিযোগটি যদি সত্য হয় তবে তা জনসমক্ষে প্রমাণ করতে হবে।তিনি বিএনপিকে সেই পোস্টে ‘নাদান সরকার’ বলেও মন্তব্য করেন। আসিফের এই মন্তব্যে তুলে রাজনৈতিক নাটক মনে হলেও ধীরে ধীরে এই সংঘাত স্পষ্ট হচ্ছে। এনসিপির ভেতরে বিএনপির প্রতি এক ধরনের চাপা অসন্তোষ কাজ করছে, আর অন্যদিকে বিএনপিও এনসিপিকে ঘিরে অস্বস্তিতে পড়েছে। বিএনপি ও এনসিপির সম্পর্কের ভেতরে এখন স্পষ্ট টানাপোড়েন দৃশ্যমান। রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই বাড়ছে পারস্পরিক অস্বস্তি ও বাকযুদ্ধ। আসলে বিএনপির সঙ্গে নানান ইস্যুতে এনসিপির এই বিরোধ এখন আর শুধু আলোচনার টেবিল বা সভা সমাবেশে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন পুরোপুরি প্রকাশ্য রাজনৈতিক টানাপোড়েনে রূপ নিয়েছে। এই বক্তব্যের পরপরই আসিফ মাহমুদ সময় নষ্ট না করে সরাসরি ফেসবুকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন: তিনি বলেন, অভিযোগটি যদি সত্য হয় তবে তা জনসমক্ষে প্রমাণ করতে হবে। শুধু এখানেই থেমে না থেকে তিনি বিএনপিকে ‘নাদান সরকার’ বলেও মন্তব্য করেন, যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন যে ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তারা এখনো প্রশাসনিক বাস্তবতা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি। সম্প্রতি ঝিনাইদহে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের এই ঘটনার পর এনসিপির প্রভাবশালী নেতা আসিফ মাহমুদ আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়ে সরাসরি হুংকার দিয়ে বলেন, “সরকারি দল যদি ভায়োলেন্স চায়, সেটা যে আমাদের থেকে ভালো কেউ পারবে না এটা ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানেই আমরা দেখিয়ে দিয়েছি। আমাদের সহযোদ্ধাদের ওপর যারা হামলা করেছে, তাদেরকে আজ রাতের মধ্যে গ্রেপ্তার করতে হবে। যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স বেছে নেন, তাহলে আমরাও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হব।” হামলার শিকার নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, আইনমন্ত্রী এবং ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মজিদের লোকজন আমাদের ওপর এই ন্যাক্কারজনক হামলা চালিয়েছে।খোদ আইনমন্ত্রীর এলাকাতেই যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন চরম অবনতি হয়, তবে তার মন্ত্রী পদে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের ভাষা, রাজনৈতিক শিষ্টাচার নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছে । এনসিপি নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর কথাই ধরা যাক। তিনি ক্রমাগত বিএনপিকে নিয়ে এমন সব বিতর্কিত মন্তব্য করেন যা কোনো দলের পক্ষে সহজে হজম করা কঠিন। তিনি সরাসরি বলেছেন তারেক রহমানের মেরুদণ্ড আগেরবার ভেঙেছিল ডিজিএফআই আর ছাত্র জনতা এবার তারেক রহমানের ঠিক কী কী ভাঙবে সেটা নিয়ে নাকি তিনি বেশ চিন্তিত। এ ধরনের মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়িয়ে তোলে এবং প্রতিপক্ষের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে।অবশ্য কুষ্টিয়ায় ছাত্রদল তাদের নেতার এই অপমান সহ্য করতে না পেরে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর উপর ডিম নিক্ষেপ করে। বাস্তবে বিএনপি এবং এনসিপির মধ্যে যে শীতল উত্তেজনা দীর্ঘদিন ধরে জমাট বেঁধেছিল, তা আরও উসকে দিয়েছে আসিফ মাহমুদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও হুমকিসূচক অবস্থান। তবে ঘটনাটিকে শুধু দুই দলের সরাসরি সংঘাত হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি স্পষ্ট হয় না; এর ভেতরে আরও জটিল রাজনৈতিক সংকেত কাজ করছে বলে মনে হয় । এছাড়াও এনসিপির লাগামহীন বক্তব্য ও বিএনপি’র আক্রমণাত্মক আচরণ দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কুরুচিপূর্ণ আচরণ এক ধরনের হিংসাত্মক চর্চার প্রচার করছে।
প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী: রাষ্ট্রের না দলের ?

একটি রাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের পেশাগত নিরপেক্ষতা, জবাবদিহি এবং সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রশাসনের কর্মকর্তারাই। কিন্তু যখন প্রশাসনিক কাঠামো দলীয় প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ে, তখন ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। আর সেই দুর্বলতার পরিণতিতে গণতন্ত্র কেবল সংকটাপন্নই হয় না, অনেক সময় তার অস্তিত্বও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক দল তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের সংবিধান গণতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণতন্ত্র কখনোই পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। বাংলাদেশের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে এখানে গণতন্ত্রের আবরণে বিভিন্ন ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন ও বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। পরবর্তীতে সেনা অভ্যুত্থান, দীর্ঘ সামরিক শাসন এবং ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়েছে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আশাবাদ তৈরি করলেও, ১৯৯১ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই প্রত্যাশাকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। মাগুরার উপনির্বাচন, ১৯৯৬ সালের একক নির্বাচন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাত গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ক্রমাগত দুর্বল করে তোলে। তবে ২০০৮ সালের পর পরিস্থিতি আরও গভীর সংকটে রূপ নেয়, যখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের অধীন হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়। এই বাস্তবতায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তারা সরকারের নির্বাহী বিভাগের অধীন, তবুও তাদের আচরণ ও দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছে সুস্পষ্ট আইন ও আচরণবিধি। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন না। কিন্তু বাস্তব চিত্র প্রায়শই সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয় আনুগত্য, রাজনৈতিক পরিচয় এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি ও প্রভাব অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রকাশ্যে সরকারের প্রতি রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতাসীন দলের মতাদর্শ ধারণের বিষয়টি বক্তৃতায় তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকলেও বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্বেগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। অথচ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি-২৫ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না। ফলে এই ধরনের ঘটনা শুধু আচরণবিধির লঙ্ঘনই নয়, বরং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার জন্যও বড় হুমকি। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস প্রমাণ করে যে দলীয়করণ ও আজ্ঞাবহ প্রশাসন একটি রাষ্ট্রকে কতটা বিপজ্জনক পথে নিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক আনুগত্যভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে এবং নাগরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অথচ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনিক কাঠামো নতুনভাবে নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির পথে ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি এমপি ও মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে পদোন্নতির জন্য ডিও লেটার প্রদানও এখন প্রকাশ্য বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার বিধি-২০ এবং বিধি-৩০ অনুযায়ী কোনো সরকারি কর্মচারী চাকরিসংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিক বা বাহ্যিক প্রভাব ব্যবহার করতে পারেন না। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এ অসদাচরণের জন্য তিরস্কার, পদাবনতি, বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের প্রয়োগ না থাকায় এসব বিধান অনেক ক্ষেত্রেই কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো ব্যবস্থা নয়; এটি মূলত প্রতিষ্ঠাননির্ভর একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আর সেই সংস্কৃতির ভিত্তি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন প্রশাসন রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল সংবিধান, আইন এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎও অনেকাংশে নির্ভর করছে সেই ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর। অন্যথায় প্রশাসনের মেধা ও পেশাদারিত্ব রাজনৈতিক তোষণ ও দলীয় স্বার্থের কাছে বারবার পরাজিত হবে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই দুর্বল ও অকার্যকর করে তুলতে পারে।
শেরে বাংলা ফজলুল হক বুঝেছিলেন পাকিস্তান টিকবে না

কলকাতার বাবুরা বলেছেন, “ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করার কোন দরকার নেই। ফার্মগেট আছে,ধানমণ্ডি আছে পাশে একটা কৃষি কলেজ করে দাও। “ এই ধরনের কায়েমী স্বার্থবাদী আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটিশ লর্ডের কাছে গিয়ে শেরে বাংলা ফজলুল হক বোঝালেন ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। এবার ব্রিটিশরা কিছুটা নমনীয় হল — কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল একটু দেরীতে । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক । শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯১৬ সালে মুসলিম লীগ এর সভাপতি নির্বাচিত হন । পরের বছর ১৯১৭ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এর সাধারণ সম্পাদক হন । তিনিই ইতিহাসের একমাত্র ব্যক্তি যিনি একই সময়ে মুসলিম লীগ এর প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস এর জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন । ১৯১৮ -১৯ সালে জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব । ১৯৩৭ এর নির্বাচনে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক ঘোষণা দিয়েছেন নির্বাচনে জিতলে তিনি জমিদারি প্রথা চিরতরে উচ্ছেদ করবেন। তিনি যাতে নির্বাচিত হতে না পারেন তার জন্য সারা বাংলাদেশ আর কলকাতার জমিদাররা একত্র হয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেছেন। লাভ হয়নি — কৃষকরা তাদের নেতাকে ভোট দিয়েছেন। মুসলিম লীগ এর লাহোর অধিবেশনে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বক্তব্য দিচ্ছেন । হঠাৎ করে একটা গুঞ্জন শুরু হলো, দেখা গেল জিন্নাহর বক্তব্যের দিকে কারও মনযোগ নাই । জিন্নাহ ভাবলেন, ঘটনা কী ? এবার দেখলেন, এক কোণার দরজা দিয়ে ফজলুল হক সভামঞ্চে প্রবেশ করছেন, সবার আকর্ষণ এখন তার দিকে । জিন্নাহ তখন বললেন — When the tiger arrives, the lamb must give away. এই সম্মেলনেই তিনি উত্থাপন করেছিলেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব । ১৯৪০ সালের ২২-২৪ শে মার্চ লাহোরের ইকবাল পার্কে মুসলিম লীগের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি তার প্রস্তাবে বলেন, হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার বাস্তবতায় হিন্দু মুসলিম একসাথে বসবাস অসম্ভব। সমাধান হচ্ছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র এবং পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। পাঞ্জাবের মওলানা জাফর আলী খান, সীমান্ত প্রদেশের সর্দার আওরঙ্গজেব, সিন্ধের স্যার আব্দুল্লাহ হারুন, বেলুচিস্তানের কাজী ঈসা ফজলুল হকের প্রস্তাব সমর্থন করেন। কনফারেন্সে এই প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের সময়ে হিন্দুপ্রধান প্রদেশগুলোতে মুসলিম নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকার কারণে ফজলুল হক খুবই উদ্বিগ্ন এবং কিছুটা উত্তেজিত ছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে একবার বলেন, ‘ আমি আগে মুসলিম, পরে বাঙালী (muslim first, bengali afterwards)’। বক্তৃতার এক পর্যায়ে এসে বলেন, ‘কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলোতে যদি আর কোনো মুসলিম নির্যাতিত হয় তাহলে আমি বাংলার হিন্দুদের উপর তার প্রতিশোধ নেব।’ যে ফজলুল হক তিন বছর আগে সোহরাওয়ার্দী, নাজিমউদ্দিনকে রেখে শ্যামাপ্রসাদের সাথে কোয়ালিশন সরকার গঠন করেছেন সেই ফজলুল হকের মুখে এমন বক্তব্য তখনকার ভারতে ব্যাপক আলোড়ন সৃাষ্ট করেছিল। বর্তমানে যে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার ভিত্তি হচ্ছে লাহোর প্রস্তাব। তাই ২৩ শে মার্চ কে পাকিস্তানে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু লাহোর প্রস্তাব পাশ হওয়ার কয়েকদিন পরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ চালাকির আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটি টাইপ করার সময়ে ভুল করে muslim majority states লেখা হয়েছে; আসলে হবে state । জিন্নাহর ধারণা ছিল, দেন-দরবার করে দুই পাশে দুইটা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাই স্টেটস এর জায়গায় স্টেট লিখে একটা মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্র করতে হবে। জিন্নাহর এই ধূর্ততার কারণে ফজলুল হক তার সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে সম্পৃক্ত হননি। তরুণ শেখ মুজিব যখন জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তখন অভিজ্ঞ ফজলুল হক পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। ‘তিঁনি অনুমান করতে পেরেছিলেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে কী কী দুর্দশা হবে বাংলার মানুষের। তাই তিঁনি পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন……. “বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চাননা এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রীসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়েই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন- দাঁড়িয়ে বললেন,”যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব।” এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্ঠা করতেই হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি, মার খেয়ে।” বঙ্গবন্ধু ‘ র বাবা বলেছেন , ” বাবা তুমি যাই করো শেরে বাংলার বিরুদ্ধে কিছু বলো না। শেরে বাংলা এমনি এমনি শেরে বাংলা হয়নি। “ ফজলুল হক জানতেন মাঝখানে ভারতকে রেখে পশ্চিম আর পূর্বে জোড়া দিয়ে এক পাকিস্তান করলে তা কখনো টিকবে না। ‘ জিন্নাহ আমার লাহোর প্রস্তাবের খৎনা করে ফেলেছে -বলে ফজলুল হক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সক্রিয় থাকেননি। ১৯৪৬ এ এসে জিন্নাহ সোহরাওয়ার্দীর দুই বাংলা একত্র করে স্বাধীন যুক্তবাংলার দাবী মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বাংলাও ভাগ করতে হল। ফজলুল হক বলেছিলেন, একটি পাকিস্তান কখনও টিকবে না। বাংলা এবং আসামকে নিয়ে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র করতে হবে। ১৯৭১ সালে এসে দেখা গেল, ফজলুল হকের আশঙ্কা এবং ভবিষ্যতবাণী সঠিক। ১৯৭১ এর মত এমন কিছু যে ঘটবে শেরে বাংলা ফজলুল হক তা আঁচ করতে পেরেছিলেন ১৯৪০ সালেই। তাই তিনি ১৯৪০ সালেই বাংলা আর আসাম নিয়ে পৃথক রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯৭১ এর যুদ্ধ হল ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাবের বাস্তবায়ন। লাহোর প্রস্তাব ফজলুল হক যেভাবে উত্থাপন করে ছিলেন সেভাবে মানলে একাত্তরে এই দেশে রক্তগঙ্গা বইত না। পেশাজীবনে ‘কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী ছিলেন। একদিন তাঁর জুনিয়র হাতে একগাদা পত্রিকা নিয়ে এসে বললেন, ” স্যার , দেখুন , কলকাতার পত্রিকাগুলো পাতার পর পাতা লিখে আপনার দুর্নাম ছড়িয়ে যাচ্ছে — আপনি কিছু বলছেন না । ” তিঁনি বললেন, ” ওরা আমার বিরুদ্ধে লিখছে তার মানে হল আমি আসলেই পুর্ব বাংলার মুসলমান কৃষকদের জন্য কিছু করছি। যেদিন ওরা আমার প্রশংসা করবে সেদিন মনে করবে বাংলার কৃষক বিপদে আছে। “ মুহাম্মদ ওয়াজেদ আলী বরিশাল বারের নামকরা উকিল । একবার ওয়াজেদ আলী র প্রতিপক্ষ মামলার ইস্যু জটিল হওয়ার কারণে কলকাতা থেকে তরুণ উকিল ফজলুল হককে নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীকে মোকাবেলা করার জন্য । ফজলুল হক ওই সময়ে কেবলমাত্র ফজলুল হক , শেরে বাংলা তখনও হননি । তিনি মামলা লড়তে এসেছেন , কিন্তু বিপক্ষের উকিল কে সেই খবর জানতেন না ।