অন্ধকার অর্থের আলোয় ফেরা

“এ জগতে হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি, রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী এই পঙ্ক্তিমালা যেন আধুনিক বিশ্ব-অর্থনীতির এক নিদারুণ এবং রূঢ় বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানুষের এই অন্তহীন লোভ আর অবৈধভাবে সম্পদ কুক্ষিগত করার আদিম প্রবৃত্তি থেকেই মূলত জন্ম নেয় ‘ছায়া অর্থনীতি’ বা ‘কালো টাকা’। যখন রাষ্ট্রের চোখ ফাঁকি দিয়ে অগোচরে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে এবং সেই অন্ধকার অর্থ রাষ্ট্রের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ করতে উদ্যত হয়, তখন সেই অর্থকে মূলধারার আলোয় ফিরিয়ে আনতে রাষ্ট্রকেই কখনো কখনো আপসের পথে হাঁটতে হয়। অনৈতিক হলেও বাস্তবতার নিরিখে করা এই কাঠামোগত আপসেরই আনুষ্ঠানিক নাম হলো ‘কালো টাকা সাদা করার নীতি’ বা ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’, যা যুগ যুগ ধরে বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়। কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি বিশ্ব অর্থনীতিতে সাধারণত ‘ট্যাক্স অ্যামনেস্টি’ (Tax Amnesty) বা ‘ভলান্টারি ডিসক্লোজার প্রোগ্রাম’ (VDP) নামে পরিচিত। এটি মূলত সরকারের এমন একটি নীতি, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবৈধ উৎস থেকে বা অপ্রদর্শিতভাবে অর্জিত অর্থ নির্দিষ্ট কর ও জরিমানাসাপেক্ষে বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রকাশনা অনুযায়ী, এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি করা, কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করা এবং ছায়া অর্থনীতিকে (Shadow Economy) আনুষ্ঠানিক বা মূলধারার অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা। আধুনিক কর ব্যবস্থায় এই ধারণার প্রয়োগ শুরু হয় মূলত বিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে। ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের কর প্রশাসন (IRS) প্রথম স্বেচ্ছা ঘোষণার সুযোগ দিয়ে করদাতাদের অপরাধমূলক মামলা থেকে মুক্তির নীতি গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য দেশের জন্য একটি মডেল হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে ১৯৫১ সালে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে এমন উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ১৯৭৫, ১৯৯৭ সালের ‘ভিডিস’ (VDIS) ও ২০১৬ সালে বিভিন্ন পর্যায়ে অপ্রদর্শিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ইউরোপের দেশ ইতালিতেও ২০০১ সালে “স্কুডো ফিসক্যালে” (Scudo Fiscale) নামে একটি বড় ট্যাক্স অ্যামনেস্টি চালু হয়, যার মাধ্যমে বিদেশে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কালো টাকা সাদা করার এই প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে করদাতা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে দেশের ভেতরে বা বিদেশে থাকা তার অপ্রদর্শিত আয় ও সম্পদের পরিমাণ স্বেচ্ছা ঘোষণা (Voluntary Declaration) করেন। এরপর কর কর্তৃপক্ষ সেই ঘোষিত সম্পদের বাজারমূল্য যাচাই করে তার ওপর প্রযোজ্য কর ও জরিমানার হার নির্ধারণ করে। পরবর্তী ধাপে করদাতা নির্ধারিত সেই অর্থ পরিশোধ করেন, যেখানে সাধারণত জরিমানা স্বাভাবিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার তুলনায় কিছুটা কম রাখা হয় যাতে মানুষ এই সুযোগ নিতে উৎসাহিত হয়। সবশেষে, সকল শর্ত পূরণের পর করদাতাকে পূর্বের কর ফাঁকির জন্য ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা থেকে আইনি সুরক্ষা বা দায়মুক্তি (Legal Immunity) দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নীতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রয়োগ করা হয়েছে। ওইসিডি (OECD)-এর একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইন্দোনেশিয়ায় একটি বিশাল ট্যাক্স অ্যামনেস্টি প্রোগ্রাম চালু করা হয়, যেখানে প্রায় ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ঘোষণা করা হয় এবং সরকার প্রায় ৯.৬ বিলিয়ন ডলার কর আদায় করতে সক্ষম হয়, যা বিশ্বের অন্যতম সফল একটি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত। একই বছর আর্জেন্টিনায় ‘সিনসেরামিয়েন্তো ফিসক্যাল’ কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১১৬ বিলিয়ন ডলারের অঘোষিত সম্পদ মূলধারায় আসে। অন্যদিকে, ভারতের ২০১৬ সালের ইনকাম ডিক্লারেশন স্কিমে (IDS) প্রায় ৬৫,২৫০ কোটি রুপি অঘোষিত সম্পদ হিসেবে ঘোষিত হয়। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রও ২০০৯ সাল থেকে অফশোর ভলান্টারি ডিসক্লোজার প্রোগ্রামের (OVDP) মাধ্যমে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিদেশি অ্যাকাউন্টে লুকানো অর্থ মূলধারায় আনতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিকোণ থেকে কর সাধারণ ক্ষমার প্রভাব দ্বিমুখী। স্বল্পমেয়াদে এটি হঠাৎ করে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়িয়ে দেয়, যা বিশেষ করে অর্থনৈতিক মন্দা বা বাজেটের ঘাটতি মোকাবেলায় সাময়িক স্বস্তি দেয় এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য বৃদ্ধি করে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিতে একে ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ (Moral Hazard) বা নৈতিক স্খলনের ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়। অর্থনীতিবিদ জেমস আল্ম (James Alm) এবং ডব্লিউ. বেক-এর ১৯৯০ সালের বিখ্যাত গবেষণায় দেখা গেছে, ঘন ঘন ট্যাক্স অ্যামনেস্টি দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের কর দেওয়ার প্রবণতা (Tax compliance) কমে যায়। নিয়মিত ও সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হন, কারণ তারা দেখতে পান যে কর ফাঁকি দিয়ে পরবর্তীতে সামান্য জরিমানা দিয়েই পার পাওয়া সম্ভব। কালো টাকা সাদা করার নীতি বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি সাময়িক দাওয়াই বা ‘কুইক ফিক্স’ হিসেবে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কর শৃঙ্খলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই কারণে আধুনিক বিশ্বে ওইসিডি (OECD) এবং জি-২০ ভুক্ত উন্নত দেশগুলো এখন এই ধরনের কর ক্ষমার বদলে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অফ ইনফরমেশন (AEOI), আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং তথ্য বিনিময় এবং উন্নত ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধের ওপরই সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করছে।
মানুষ কি টাকা তুলছে, নাকি আস্থা সরিয়ে নিচ্ছে?

ব্যাংকিং খাতে একটি পুরোনো সত্য আছে। ব্যাংক ভাঙে টাকা শেষ হয়ে গেলে নয়, ভাঙে যখন মানুষের বিশ্বাস শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে গত পাঁচ কর্মদিবসে ৩,৫০০ কোটিরও বেশি টাকা উত্তোলনের ঘটনা সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনে দিয়েছে। ঘটনাটি কেবল একটি ব্যাংক থেকে টাকা তোলার পরিসংখ্যান নয়; এটি আমানতকারীদের আস্থা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসের একটি বড় সংকেত। নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পরপরই ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ, কর্মসূচি এবং পরিচালনা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে চেয়ারম্যানের প্রথম কার্যদিবসের বোর্ড সভা সরাসরি নয়, অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। এরপরই শুরু হয় আরেক ধরনের ভোট ,নীরব ভোট। এই ভোট ব্যালট বাক্সে নয়, ব্যাংকের কাউন্টারে দেওয়া হয়।গ্রাহকরা প্রতিবাদ মিছিলে না গিয়েও নিজেদের অবস্থান জানাতে শুরু করেন টাকা তুলে নেওয়ার মাধ্যমে। মাত্র চার কর্মদিবসে প্রায় ২,৫৭০ কোটি টাকা এবং পরবর্তী একদিনে আরও প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা উত্তোলিত হয়। মোট পরিমাণ ৩,৫০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই বলেন, একজন আমানতকারী যখন টাকা জমা রাখেন, তখন তিনি শুধু টাকা নয়, বিশ্বাসও জমা রাখেন। আর যখন সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে, তখন মানুষ প্রথমেই নিজের সঞ্চয় নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে চায়।ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহেও সেই মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কেউই এখনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে তারল্য সহায়তা দেওয়া হবে। অর্থাৎ সংকটটি আপাতত অর্থের ঘাটতির নয়, বরং আস্থার ঘাটতির। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ব্যাংকটি গত এক বছরে আমানত বৃদ্ধির দিক থেকে ইতিবাচক অবস্থানে ছিল। পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের পর ২০২৫ সালে ইসলামী ব্যাংকের মোট আমানত দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটিরও বেশি নতুন আমানত যুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ যে ব্যাংকে মানুষ নতুন করে টাকা রাখতে শুরু করেছিল, সেই ব্যাংক থেকেই এখন মানুষ দ্রুত টাকা সরিয়ে নিচ্ছে। এ কারণেই ৩,৫০০ কোটি টাকার এই উত্তোলনকে শুধু আর্থিক ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি “Confidence Test”। মানুষ কি ব্যাংকের নেতৃত্বে আস্থা রাখছে? মানুষ কি মনে করছে তাদের সঞ্চয় নিরাপদ? মানুষ কি বিশ্বাস করছে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তগুলো স্বচ্ছ হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই এখন নির্ধারণ করবে ইসলামী ব্যাংকের পরবর্তী পথচলা। ইতিহাস বলে, ব্যাংকে দীর্ঘ লাইনের শুরু হয় সাধারণত গুজব থেকে; কিন্তু সেই গুজব যদি আস্থার সংকটের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে সেটি দ্রুত ব্যাংক রান (Bank Run)-এর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিকে সেই পর্যায়ে বলতে নারাজ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, তবুও কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা উত্তোলন বাজারে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই… ইসলামী ব্যাংকের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কি তারল্য সংকট, নাকি বিশ্বাস পুনর্গঠন? কারণ ব্যাংকিং জগতে টাকা হারালে তা ফেরত আনা যায়; কিন্তু বিশ্বাস হারালে সেটি ফিরিয়ে আনতে কখনো কখনো বছরের পর বছর লেগে যায়।
ফার্মেসি খাতে কর্পোরেট পুঁজির উত্থান: আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নাকি ক্ষুদ্র ব্যবসার অস্তিত্ব সংকট?

বাংলাদেশের ফার্মেসি খাতে এক নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই খাত মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত এই বাজারে প্রবেশ করছে। কেউ এই পরিবর্তনকে স্বাস্থ্যসেবা খাতের আধুনিকায়ন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন সংকটের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করছেন। বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান IQVIA-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওষুধ বাজারের আকার বর্তমানে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এই বাজারকে ঘিরে এখন বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। এই প্রবণতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো আকিজ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান AKIJ Pharmacy। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে আউটলেট চালু করেছে এবং আগামী কয়েক বছরে ব্যাপক সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কয়েক হাজার ফার্মেসি আউটলেট গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। শুধু আকিজ নয়, AKS Pharmacy-ও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ৬০টির বেশি আউটলেট পরিচালনা করছে এবং বিদেশি বিনিয়োগও আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে BRAC Healthcare এমন একটি মডেল চালু করেছে যেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক সেবা এবং ফার্মেসি একই প্ল্যাটফর্মের আওতায় পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক চেইন Aster Pharmacy বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করেছে। ফলে দেশের ফার্মেসি বাজারে এখন শুধু স্থানীয় নয়, বৈশ্বিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর এই আগ্রাসী সম্প্রসারণের পেছনে শক্তিশালী আর্থিক সক্ষমতা বড় ভূমিকা রাখছে। তাদের হাতে রয়েছে বিপুল মূলধন, উন্নত প্রযুক্তি, আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ব্যাপক বিপণন সক্ষমতা। তারা চাইলে একই সময়ে শত শত আউটলেট চালু করতে পারে, দীর্ঘ সময় কম মুনাফায় ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে এবং বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে পারে। অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ স্থানীয় ফার্মেসি পরিচালিত হয় সীমিত মূলধনের ওপর। অনেক ক্ষেত্রে একজন উদ্যোক্তা কিংবা একটি পরিবারই ব্যবসার প্রধান ভরসা। তাদের পক্ষে বড় পরিসরে ওষুধ মজুদ রাখা, আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা, নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট নিয়োগ করা কিংবা বড় আকারে প্রচারণা চালানো সহজ নয়। ফলে একই বাজারে কর্পোরেট চেইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে কর্পোরেট চেইনগুলোর উত্থানের পেছনে শুধুমাত্র ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নয়, স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত একটি বাস্তবতাও রয়েছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ফার্মেসি খাতে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টের অভাব, ওষুধ সংরক্ষণের দুর্বল ব্যবস্থা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট চেইনগুলো নিজেদেরকে “নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য” বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন রেকর্ড, কোল্ড-চেইন মেইনটেন্যান্স, সরাসরি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ওষুধ সংগ্রহ এবং মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। অর্থাৎ তারা শুধু ওষুধ বিক্রি করছে না; তারা একটি নতুন ধারণা বিক্রি করছে, যা সংগঠিত ও প্রযুক্তিনির্ভর ফার্মেসি ব্যবস্থার ধারণা। এখানেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ প্রতিযোগিতা শুধু মূলধনের নয়; এটি এখন গ্রাহকের আস্থা অর্জনের প্রতিযোগিতাও। যদি সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে কর্পোরেট চেইনই নিরাপদ ওষুধ পাওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য মাধ্যম, তাহলে স্থানীয় ফার্মেসিগুলো ক্রমেই বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। বড় চেইন ফার্মেসিগুলো বাজারে প্রবেশের পর গ্রাহকরা সাধারণত উন্নত পরিবেশ, দীর্ঘ সময় সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং কখনও কম দামের সুবিধা পান। কিন্তু একই সঙ্গে বহু ছোট ব্যবসা ধীরে ধীরে বাজার থেকে ছিটকে পড়ে। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারের বড় অংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বাংলাদেশেও এখন সেই প্রশ্ন সামনে আসছে। যদি আগামী দশকে দেশের প্রধান শহরগুলোর ফার্মেসি বাজার কয়েকটি বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অবস্থান কী হবে? যারা বছরের পর বছর নিজেদের সঞ্চয়, শ্রম এবং অভিজ্ঞতা দিয়ে এই খাত গড়ে তুলেছেন, তারা কি একইভাবে টিকে থাকতে পারবেন? কর্মসংস্থানের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে দেশের অসংখ্য ক্ষুদ্র ফার্মেসির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। কর্পোরেট চেইনগুলোর সম্প্রসারণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও কর্মচারীর জন্য অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষমতা ধীরে ধীরে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে বাজারের ভারসাম্য নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে এই গল্পের আরেকটি দিকও রয়েছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও উপশহর অঞ্চলে এখনও ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক আস্থা এবং মানবিক সেবার মূল্য অনেক বেশি। স্থানীয় ফার্মেসিগুলো অনেক সময় বাকিতে ওষুধ দেয়, জরুরি প্রয়োজনে বাড়িতে পৌঁছে দেয় এবং দীর্ঘদিনের পরিচয়ের ভিত্তিতে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করে। এই সামাজিক পুঁজির সঙ্গে কর্পোরেট মূলধনের সরাসরি প্রতিযোগিতা সবসময় সহজ নয়। ফলে বাংলাদেশের ফার্মেসি খাতের সামনে মূল প্রশ্নটি শুধু কর্পোরেট বনাম ক্ষুদ্র ব্যবসা নয়। প্রশ্ন হলো কীভাবে আধুনিক, নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যাবে, একই সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা যাবে। আগামী কয়েক বছরে এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ফার্মেসি খাত কোন পথে এগোবে। স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পথে, নাকি বাজারের ক্রমবর্ধমান কেন্দ্রীকরণের দিকে।
কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা বিশৃঙ্খলা থেকে শৃঙ্খলায় গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ

ঈদুল আজহা শেষ হলেই একসময় রাস্তায়-ডাস্টবিনে পড়ে থাকত কোরবানির চামড়া। অনেকে হতাশ হয়ে ফেলে দিতেন। কিন্তু সেই ছবিটা এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আজ চামড়া আর নষ্ট হয় না, বরং সেটা হয়ে উঠছে এতিম, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আর দরিদ্র পরিবারের জন্য একটা বড় সহায়তা। আগের দিনগুলো কেমন ছিল? কয়েক বছর আগেও চামড়া সংগ্রহের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। পাড়ার ছেলেরা সারাদিন রোদে ঘুরে মাত্র ৫০-১০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করত। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম পেত না বলে অনেকে রাগ করে চামড়া রাস্তায় ফেলে দিত। ফলে একদিকে দেশের সম্পদ নষ্ট হতো, অন্যদিকে এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো তাদের প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত হতো। কে বদলে দিল ছবিটা? ২০২২ সাল থেকে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ নামের একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই কাজটা হাতে নিয়েছে। তারা চামড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সুন্দরভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার মাঠে প্রতি ঈদে তারা লক্ষাধিক চামড়া সংরক্ষণ করে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশে প্রায় ২৫০টির বেশি মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এই চামড়ার আয় থেকে উপকার পাচ্ছে। ৭ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর অক্লান্ত পরিশ্রম প্রতি ঈদে গাউসিয়া কমিটির প্রায় সাত হাজার স্বেচ্ছাসেবী মাঠে নেমে পড়েন। তারা চামড়া সংগ্রহ করেন, সঠিক জায়গায় নিয়ে যান এবং ভালোভাবে সংরক্ষণ করেন। তাদের এই নিষ্ঠার কারণে চামড়া নষ্ট হওয়া অনেক কমেছে এবং দামও কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। কী কী পরিবর্তন হয়েছে? সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হলো, চামড়া আর আগের মতো অপচয় হয় না। রাস্তায় পড়ে নষ্ট হওয়া বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য এখন অনেক কম দেখা যায়। সংগঠিত সংগ্রহের কারণে প্রায় সব চামড়াই এখন সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে এবং দেশের সম্পদ হিসেবে রক্ষা পাচ্ছে। এর পাশাপাশি এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো নামমাত্র টাকা পেত, সেখানে এখন চামড়া বিক্রির আয় অনেক বেশি। সারাদেশের ২৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এই আয় থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে, যা তাদের খাবার, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। চামড়া ব্যবস্থাপনায়ও একটা স্পষ্ট শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দখলদারিত্ব অনেকটাই কমেছে। স্বেচ্ছাসেবীরা সরাসরি মাঠ থেকে সংগ্রহ করায় মাঝখানের অসাধু মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব কমে গেছে। ফলে চামড়ার দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং ব্যবস্থাটা আর আগের মতো অগোছালো নেই। সবথেকে সুন্দর পরিবর্তন হয়েছে মানুষের মনে। যারা একসময় হতাশ হয়ে চামড়া ফেলে দিতেন, তারা এখন নিশ্চিন্তে চামড়া দিচ্ছেন। কারণ তারা জানেন, তাদের কোরবানির এই চামড়া সত্যিই এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কাজে লাগছে। এতে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটা আত্মিক সন্তুষ্টিও তৈরি হয়েছে। এভাবেই গাউসিয়া কমিটির উদ্যোগ একটা ধর্মীয় উৎসবকে ধীরে ধীরে একটি অর্থবহ সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করছে। কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা এখন শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা একটা সুন্দর সামাজিক দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। গাউসিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা যেভাবে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।