ঈদের চামড়া থেকে এতিমের আশা: গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের অবদান

  আগের দিনগুলো কেমন ছিল? কয়েক বছর আগেও চামড়া সংগ্রহের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। পাড়ার ছেলেরা সারাদিন রোদে ঘুরে মাত্র ৫০-১০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করত। সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দাম পেত না বলে অনেকে রাগ করে চামড়া রাস্তায় ফেলে দিত। ফলে একদিকে দেশের সম্পদ নষ্ট হতো, অন্যদিকে এতিমখানা ও মাদ্রাসাগুলো তাদের প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত হতো। কে বদলে দিল ছবিটা? ২০২২ সাল থেকে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ নামের একটি অরাজনৈতিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এই কাজটা হাতে নিয়েছে। তারা চামড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সুন্দরভাবে সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার মাঠে প্রতি ঈদে তারা লক্ষাধিক চামড়া সংরক্ষণ করে। শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশে প্রায় ২৫০টির বেশি মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন এই চামড়ার আয় থেকে উপকার পাচ্ছে। ৭ হাজার স্বেচ্ছাসেবীর অক্লান্ত পরিশ্রম প্রতি ঈদে গাউসিয়া কমিটির প্রায় সাত হাজার স্বেচ্ছাসেবী মাঠে নেমে পড়েন। তারা চামড়া সংগ্রহ করেন, সঠিক জায়গায় নিয়ে যান এবং ভালোভাবে সংরক্ষণ করেন। তাদের এই নিষ্ঠার কারণে চামড়া নষ্ট হওয়া অনেক কমেছে এবং দামও কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে। কী কী পরিবর্তন হয়েছে? সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হলো, চামড়া আর আগের মতো অপচয় হয় না। রাস্তায় পড়ে নষ্ট হওয়া বা ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়ার দৃশ্য এখন অনেক কম দেখা যায়। সংগঠিত সংগ্রহের কারণে প্রায় সব চামড়াই এখন সঠিক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে এবং দেশের সম্পদ হিসেবে রক্ষা পাচ্ছে। এর পাশাপাশি এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জীবনে সত্যিকারের পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো নামমাত্র টাকা পেত, সেখানে এখন চামড়া বিক্রির আয় অনেক বেশি। সারাদেশের ২৫০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান এই আয় থেকে সরাসরি লাভবান হচ্ছে, যা তাদের খাবার, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে। চামড়া ব্যবস্থাপনায়ও একটা স্পষ্ট শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। সিন্ডিকেটের একচেটিয়া দখলদারিত্ব অনেকটাই কমেছে। স্বেচ্ছাসেবীরা সরাসরি মাঠ থেকে সংগ্রহ করায় মাঝখানের অসাধু মধ্যস্থতাকারীদের প্রভাব কমে গেছে। ফলে চামড়ার দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং ব্যবস্থাটা আর আগের মতো অগোছালো নেই। সবথেকে সুন্দর পরিবর্তন হয়েছে মানুষের মনে। যারা একসময় হতাশ হয়ে চামড়া ফেলে দিতেন, তারা এখন নিশ্চিন্তে চামড়া দিচ্ছেন। কারণ তারা জানেন, তাদের কোরবানির এই চামড়া সত্যিই এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কাজে লাগছে। এতে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একটা আত্মিক সন্তুষ্টিও তৈরি হয়েছে। এভাবেই গাউসিয়া কমিটির উদ্যোগ একটা ধর্মীয় উৎসবকে ধীরে ধীরে একটি অর্থবহ সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করছে। কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনা এখন শুধু ধর্মীয় বিষয় নয়, এটা একটা সুন্দর সামাজিক দায়িত্ব হয়ে উঠেছে। গাউসিয়া কমিটির স্বেচ্ছাসেবীরা যেভাবে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।