“দ্য ফরটি রুলস অব লাভ”: আধ্যাত্মিকতার আড়ালে রোমান্টিক আবেগের উপন্যাস
“ইশ্বর এক সুনিপুণ ঘড়ি প্রস্তুতকারক। পৃথিবীতে যা হয়, ঠিক তার সময়মতোই হয়। এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না। সবার জন্য সেই ঘড়ি একইভাবে কাজ করে। সেই ঘড়িতে প্রত্যেকের ভালোবাসা আর মৃত্যুর সময় সুনির্দিষ্ট।” বিশ্বজুড়ে বহুল আলোচিত ও জনপ্রিয় উপন্যাস The Forty Rules of Love পাঠকদের সামনে আধ্যাত্মিক ভালোবাসা, সুফি দর্শন এবং আত্মঅন্বেষণের এক রহস্যময় জগৎ তুলে ধরেছে। তুর্কি লেখিকা এলিফ শাফাক এই উপন্যাসে প্রেম, ধর্ম, আত্মিক মুক্তি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণাকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বইটি অনেক ক্ষেত্রেই সুফিবাদের প্রকৃত দর্শনের চেয়ে রোমান্টিক আবেগ এবং পার্থিব সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। উপন্যাসটির কাহিনি গড়ে উঠেছে ত্রয়োদশ শতকের মহান সুফি কবি Jalal ad-Din Muhammad Rumi এবং তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক Shams Tabrizi-কে ঘিরে। একইসঙ্গে আধুনিক সময়ের এলা নামের এক নারীর ব্যক্তিগত সংকটও সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে। লেখক এই দুই ভিন্ন সময়কে মিলিয়ে ভালোবাসা ও আত্মিক মুক্তির একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেয়েছেন। উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এলা—চল্লিশোর্ধ্ব এক নারী, যার দীর্ঘ বিশ বছরের সংসার এবং তিনটি সন্তান রয়েছে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের অনলাইন আলাপ ও একটি পাণ্ডুলিপির প্রভাবে তিনি নিজের পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লেখক এই ঘটনাকে আত্ম-আবিষ্কার বা আত্মিক জাগরণ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন। তবে বাস্তবতার দৃষ্টিতে এটি আত্মিক মুক্তির চেয়ে বরং দায়িত্বহীনতার এক রোমান্টিক উপস্থাপন বলেই মনে হয়। এলার জীবনের শূন্যতা, একঘেয়েমি ও আবেগগত অপূর্ণতাকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন সংসার ভেঙে বেরিয়ে আসাই মুক্তির একমাত্র পথ। ফলে এখানে আত্মিক উপলব্ধির চেয়ে ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের জয়গানই বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বইটির মূল আকর্ষণ “চল্লিশটি প্রেমের নীতি” বা “Rules of Love”। কিন্তু উপন্যাস যত এগোয়, ততই বোঝা যায়—এখানে স্রষ্টার প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের চেয়ে মানবিক সম্পর্ক, মানসিক আকর্ষণ এবং আবেগঘন সংযোগের দিকগুলোই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। অথচ সুফিবাদের মূল দর্শন হলো আত্মার পরিশুদ্ধি, অহংবোধের বিলুপ্তি এবং স্রষ্টার প্রেমে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। কিন্তু এই উপন্যাসে বারবার পার্থিব ভালোবাসা ও আধ্যাত্মিক ভালোবাসাকে প্রায় একই স্তরে দাঁড় করানো হয়েছে। ফলে আধ্যাত্মিকতার গভীরতা অনেকাংশেই রোমান্টিক আবেগের ভিড়ে চাপা পড়ে গেছে। উপন্যাসের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র শামস তাবরিজিকেও এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন তিনি এক রহস্যময় অলৌকিক চরিত্র—যিনি মানুষের মন পড়তে পারেন কিংবা অতিমানবীয় ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে শামস ছিলেন আত্মিক জাগরণের একজন পথপ্রদর্শক, কোনো জাদুকরসুলভ চরিত্র নন। সুফিবাদের মূল শিক্ষা অলৌকিকতা প্রদর্শন নয়; বরং আত্মসংযম, ধৈর্য, বিনয় এবং স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন। অথচ উপন্যাসে শামসকে অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক রহস্যবাদী চরিত্রের মতো উপস্থাপন করা হয়েছে। বইটিতে ভালোবাসার কথা বলা হলেও সেই ভালোবাসা বারবার দৈহিক ও মানসিক চাহিদার বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে। শামস মুখে পার্থিব প্রেমকে অতিক্রম করার কথা বললেও কাহিনির বড় অংশজুড়ে রয়েছে ব্যক্তিগত আকর্ষণ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আবেগের দ্বন্দ্ব। ফলে প্রশ্ন জাগে—এই উপন্যাস কি সত্যিই স্রষ্টার প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসার গল্প, নাকি মানবিক প্রেমকে আধ্যাত্মিকতার ভাষায় ব্যাখ্যা করার একটি সাহিত্যিক প্রয়াস? বইটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ সম্ভবত শামস ও কিময়ার বিয়ের প্রসঙ্গ। শামসকে যেখানে উচ্চমাত্রার আধ্যাত্মিক জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে দেখানো হয়েছে, সেখানে কিময়ার প্রতি তাঁর দূরত্ব, মানসিক অবহেলা এবং কিময়ার করুণ পরিণতি পুরো কাহিনির সঙ্গে এক ধরনের নৈতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। সবশেষে বলা যায়, সহজ ভাষা, আবেগময় উপস্থাপন এবং দার্শনিক আবহের কারণে The Forty Rules of Love বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কিন্তু যারা প্রকৃত সুফিবাদ, রুমি-শামসের ঐতিহাসিক সম্পর্ক কিংবা আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীরতা খুঁজতে চান, তাদের জন্য বইটি অনেকাংশে হতাশাজনক হতে পারে। আধ্যাত্মিকতার গভীর সত্যকে স্পর্শ করার বদলে উপন্যাসটি অনেক জায়গায় রোমান্টিকতা ও ব্যক্তিগত আবেগকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। তাই এটি হয়তো নিখাদ সুফি দর্শনের বই নয়; বরং আধ্যাত্মিকতার আবরণে লেখা এক আবেগনির্ভর সাহিত্যিক উপন্যাস।
দ্রোহের আড়ালে যে মানুষটি শুধু একজন বাবা

কলকাতা পুলিশ নজরুলের বাড়ি তল্লাশি করতে এল। যদি কোনো নিষিদ্ধ বই পাওয়া যায়। বিষের বাঁশি, ভাঙার গান, প্রলয়শিখা ছিল তখন বাজেয়াপ্ত। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পুলিশ কিছু পেল না। তল্লাশিতে নজরুল কোনো বাধা দেননি। বাড়ির জিনিসপত্র সব লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নেই। একটা সময় পুলিশের নজর গেল একটা বাক্সের দিকে। ওই দিকে এগিয়ে যেতেই কবি পাগলের মতো হয়ে গেলেন। তল্লাশি দলে থাকা পুলিশের প্রধান কর্মকর্তাকে বললেন, ‘আর যা-ই করুন, এ বাক্সে হাত দেবেন না।’ পুলিশ জেদ করে বাক্স খুলে দেখলেন। সেখানে ছোট একটি ছেলের জামা, খেলনা সুন্দরভাবে সাজানো। সেগুলো ছিল নজরুলের প্রয়াত ছেলে বুলবুলের স্মৃতি। লজ্জিত পুলিশ কর্মকর্তা দেখলেন, নজরুলের চোখে পানি টলমল করছে। দ্রোহের কবি হিসেবে বাংলা সাহিত্যে যাঁর পরিচয়, তাঁর মনে পুত্রস্নেহের এই কোমল দিকটি উঠে এসেছে আরেক ছেলে কাজী সব্যসাচীর স্মৃতিচারণামূলক লেখা ও সাক্ষাৎকারে। বাবা হিসেবে সন্তানদের নিয়ে খুব ভাবতেন। চার বছরের ছোট্ট বুলবুল যখন মারা যায়, তখন তিনি পুত্রশোকে পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। বাবা প্রসঙ্গে কাজী সব্যসাচী বলেছিলেন, ‘এমন উদার হৃদয়বান বাবা কজন পেয়েছেন, জানি না। এদিক দিয়ে আমরা দুই ভাই ছিলাম সত্যিই ভাগ্যবান।’ কাজী সব্যসাচীর ডাকনাম সানি। কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রিয় চীনের বিপ্লবী নেতা সান-ইয়াৎ সেনের নাম থেকে এ নাম রাখা হয়। আর লেনিনের নাম অনুসরণে কাজী অনিরুদ্ধকে ‘নিনি’ নামে ডাকতেন কবি। কাজী নজরুলের চার ছেলে ছিল। প্রথম ছেলে কৃষ্ণ মুহম্মদ খুব ছোট বয়সেই মারা যায়। দ্বিতীয় ছেলে অরিন্দম বুলবুল মাত্র চার বছর বয়সে বসন্ত রোগে মারা যায়। ‘তোমার সানি যুদ্ধে যাবে/ মুখটি করে চাঁদ পানা/ কোল ন্যাওটা তোমার নিনি/ বোমার ভয়ে আধখানা…’—ছেলে কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধকে নিয়ে এ ছড়াটি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন বাবা কাজী নজরুল ইসলাম। দুই ছেলেকে নিয়ে আরও ছড়া বানিয়েছিলেন নজরুল, ‘সানি নিনি দুই ভাই/ ব্যাং মারে ঠুইঠাই।’কাজী সব্যসাচীর এক স্মৃতিচারণায় জানা যায়, যখন নজরুল পরিবার থেকে দূরে কোথাও যেতেন, নিয়মিত দুই ছেলেকে চিঠি লিখতেন। সব চিঠির শেষে থাকত ‘আমার চুমু নিও। ইতি বাবা।’ অসুস্থ হওয়ার বেশ কিছুদিন আগে নজরুল কলকাতার বাগুইআটিতে একটা বাড়ি করার কথা ভেবেছিলেন। সেখানে কয়েক বিঘা জমির বায়নার টাকাও আগাম দিয়েছিলেন। প্রায়ই পরিবারের সবাইকে নিয়ে তিনি সে জমি দেখতে যেতেন। বাসস্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন এইভাবে—‘বাড়িটা হবে বাংলো প্যাটার্নের। সামনে বা মাঝখানে একটা পুকুর থাকবে। পুকুরে মাছ ছাড়া হবে। প্রয়োজনমতো জাল কিংবা ছিপ ফেলে তা ধরা হবে। দক্ষিণ দিকে থাকবে আমার আর নিনির ঘর। তবে পুকুরের কাছে নিনি যাতে না যায়, তারও একটা ব্যবস্থা থাকবে, নিনি বড় শান্ত। সাঁতার জানে না।’ তবে সেখানে জমি কেনা হয়নি নজরুলের, বাড়িও করা হয়নি। একদিন সবাইকে নিয়ে বাগুইআটিতে গেছেন জমি দেখতে। কোথায় বাগান হবে, কোথায় বৈঠকখানা—এসব কথা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময় হঠাৎ কী একটা উৎকট গন্ধে হকচকিয়ে গেলেন কবি। ওই সময় রাস্তা দিয়ে ময়লা ফেলা গাড়ি যাচ্ছিল। নজরুল নাকে রুমাল চাপা দিয়ে পকেট থেকে সুগন্ধি বের করে নিজের নাকে লাগালেন। দুই ছেলের নাকে নাকে ঘষে দিয়ে বললেন, ‘না, এখানে বাড়ি করা হবে না। এই দুর্গন্ধে আমার লেখাটেখা বেরোবে না। ছেলেরা মারা পড়বে।’ দুই ছেলে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে প্রায়ই নাটক-সিনেমা দেখতে যেতেন নজরুল। বাড়ির বাইরে ছেলেদের নিয়ে গেলে সব সময় লক্ষ রাখতেন। কবি সময় পেলেই ফুটবল খেলা দেখতে যেতেন। একদিন দুই ছেলেকে নিয়ে নজরুল আইএফএ শিল্ডের মোহামেডান স্পোর্টিং বনাম কেওসিবির খেলা দেখতে গেছেন। খেলা শেষে হঠাৎ খেয়াল করলেন, সঙ্গে দুই ছেলে নেই। রীতিমতো চিৎকার শুরু করেছিলেন নজরুল, ‘সানি কোথায়, নিনি কোথায়?’ মাঠসুদ্ধ লোক হাঁ করে দেখছে। শেষে দুই ছেলে পেয়ে ট্যাক্সি করে বাড়ি এসে তিনি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। আদরের পাশাপাশি শাসনেও ছিল নজরুলের নিজস্ব রীতি। একদিন দুপুরবেলা পরিবারের বড় সদস্যদের নিয়ে জমিয়ে তাস খেলছিলেন নজরুল। এই সময় সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ পাশের ঘরে কী করা যায়, সেই ভাবনায় অস্থির। অনিরুদ্ধ দেশলাই জোগাড় করে আনলেন। সব্যসাচী কাঠি জ্বালিয়ে সোফায় ধরিয়ে দিলেন আগুন। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে চিৎকার শোনা গেল। হন্তদন্ত হয়ে সবাই ছুটলেন পাশের ঘরে। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। দুটো সোফাই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বুঝতে কারও বাকি রইল না এ কাদের কীর্তি। হুংকার ছেড়ে চোখ পাকিয়ে নজরুল এমন করে দুই ছেলের দিকে তাকালেন যে দুই ভাইয়ের হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল।