ইলমের ঘরে ভয় কেন ? মাদ্রাসায় শিশুর নিরাপত্তা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

“আমার ছেলে আমার মৃত্যুর পর আমার জানাজা পড়াবে, আমার নাতি আমার মৃত্যুর পর দোয়া-কুলখানি করবে” এভাবেই প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ শিশুকে মাদ্রাসায় ভর্তি করায় তাদের পরিবার। একটি শিশু যখন পরিবারের হাত ধরে কোনো মাদ্রাসায় যায়, তখন তার সঙ্গে শুধু বই-খাতা নয়, পরিবারের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসটিও সেই প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অভিভাবকের প্রত্যাশা থাকে—সন্তান সেখানে ইলমে দ্বীন অর্জন করবে, নৈতিকভাবে বেড়ে উঠবে, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দ্বীনের হেফাজত করবে এবং নিরাপদ থাকবে। কিন্তু সেই নিরাপত্তাই যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন বিষয়টি আর কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সমাজ ও রাষ্ট্রের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রশ্ন। বাংলাদেশে কওমি মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা, প্রাইভেট মাদ্রাসা, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এগুলোর উদ্দেশ্য, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাক্রমে পার্থক্য থাকলেও একটি জায়গায় তাদের কোনো পার্থক্য থাকার কথা নয়—তা হলো শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আপনি জানেন কি, সমস্যাটি কতটা বড়? বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও রহস্যজনক মৃত্যুর একাধিক ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ঢাকার রায়েরবাগে ১২ বছর বয়সী নাঈম শেখের মরদেহ মাদ্রাসার শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয় এবং তার শরীরে বেত্রাঘাতের দাগ পাওয়া যায়; ঘটনায় দুই শিক্ষক গ্রেপ্তার হন। বরিশালে ১১ বছর বয়সী জান্নাতুল ফেরদৌস, রাজধানীর হাতিরঝিলে ১০ বছর বয়সী তাহমিদুল ইসলাম এবং বনশ্রীতে ১০ বছর বয়সী আব্দুল্লাহর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। আব্দুল্লাহর ময়নাতদন্তে পায়ুপথে জখমের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে কুড়িগ্রামে ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগ এবং নেত্রকোনায় ১১ বছর বয়সী এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে রাজশাহী, গৌরনদী, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম, নাসিরনগর, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর, লালমনিরহাট, গাজীপুর, ফটিকছড়ি, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া ও অন্যান্য এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, গ্রেপ্তার, কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন এমনকি মৃত্যুদণ্ডের ঘটনাও প্রকাশিত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুই রয়েছে এবং অনেক ঘটনা আবাসিক মাদ্রাসার পরিবেশে ঘটেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ৯ জন কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতা বা কঠোর শাস্তির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। অন্যদিকে, ২০২০–২০২৫ সময়ে মাদ্রাসাগুলোতে অন্তত ২১১টি ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ সরকারি জাতীয় তথ্যভাণ্ডারের সীমাবদ্ধতা, সামাজিক কলঙ্ক, ভয়, পারিবারিক চাপ এবং স্থানীয়ভাবে ঘটনা মীমাংসার প্রবণতার কারণে বাস্তব সংখ্যা প্রকাশিত ঘটনার চেয়ে বেশি হতে পারে। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদ্রাসাগুলোতে কঠোর জবাবদিহি, শিক্ষক নিয়োগে যাচাই, কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, আবাসিক পরিবেশে নজরদারি এবং অভিযোগ গোপন না রেখে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। শাসন আর নির্যাতন এক নয় আমাদের সমাজে এখনো একটি ধারণা প্রচলিত—শিক্ষক যে জায়গায় বেত দিয়ে আঘাত করেন, সে স্থান জান্নাতে যাবে। আসলে কি তাই? শিক্ষক শাসন করবেন, প্রয়োজনে কঠোর হবেন, এতে শিশুর ভবিষ্যৎ ভালো হবে—এমন ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত। কিন্তু এই ধারণার সঙ্গে শিশুকে মারধর, অপমান বা ভয় দেখানোর পার্থক্যটি স্পষ্ট করা জরুরি। শিশুর ভুল সংশোধন করা শিক্ষকের দায়িত্ব। কিন্তু শারীরিক আঘাত, অপমান, ভয় দেখানো, অমানবিক শাস্তি কিংবা যৌন হয়রানি কোনোভাবেই শিক্ষাদানের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। UNICEF-এর বাংলাদেশ বিষয়ক শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমেও শারীরিক শাস্তি, মানসিক নির্যাতন ও যৌন নির্যাতনকে শিশু সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসলামের শিক্ষায় শিশুর প্রতি দয়া ও শাসনের সীমা শিশুর প্রতি দয়া ও কোমল আচরণ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا “যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং আমাদের বড়দের অধিকার জানে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।” — সুনান আত-তিরমিজি, ১৯২০ ইসলামের পঞ্চম খলিফা হিসেবে খ্যাত উমর ইবনে আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলেও শিশুদের শাসনের ক্ষেত্রে সংযম ও সীমারেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে লেখা এক চিঠিতে শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের শাসনের ক্ষেত্রে সীমা অতিক্রম না করার নির্দেশ দেন। সেখানে শিক্ষার্থীকে তিনটির বেশি আঘাত না করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তা যেন রাগ, ব্যক্তিগত আক্রোশ বা প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে না হয়—সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইমামে আজম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-সহ একাধিক ইসলামী স্কলার শিশুকে শাসনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ও উদ্দেশ্যের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাদের আলোচনায় শিশুকে নামাজের অভ্যাস করানোর ক্ষেত্রে শাসনের কথা এলেও সেটি যেন নির্যাতনমূলক বা ক্ষতিকর না হয়, বরং সংশোধন ও শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে সীমিত থাকে—এই নীতিই গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ইসলামী শিক্ষায় শাসন ও নির্যাতন এক বিষয় নয়। শাসনের উদ্দেশ্য হবে সংশোধন, অপমান বা প্রতিশোধ নয়; আর কোনো শাস্তিই শিশুর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির কারণ হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ ﷺ আরও বলেছেন— مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” — সহিহ আল-বুখারি, ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, ২৩১৮ তাই শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা হওয়া উচিত দয়া, কোমলতা, মর্যাদা ও সংশোধন। কোনো শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠান যদি শাসনের নামে শিশুকে নির্যাতন, অপমান বা ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, তাহলে সেটিকে ইসলামের দয়া ও মানবিকতার শিক্ষার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। আসল সমস্যা কোথায়? সমস্যার একটি বড় অংশ রয়েছে ক্ষমতার অসম সম্পর্ক ও জবাবদিহির দুর্বলতায়। একজন শিশু সাধারণত তার শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তির তুলনায় ক্ষমতাহীন। শিক্ষক তার নম্বর, শাস্তি, আবাসিক জীবন কিংবা দৈনন্দিন পরিবেশের ওপর প্রভাব রাখতে পারেন। ফলে শিশু যদি মনে করে অভিযোগ করলে তার ওপর আরও শাস্তি আসতে পারে, তাহলে সে নীরব থাকতে পারে। বিশেষ করে মহিলা আবাসিক প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিটি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ সেখানে শিশু দিনের বড় একটি অংশ পরিবারের বাইরে থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ ব্যবস্থা, তদারকি এবং অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্ব বেড়ে যায়। কেন শিশুরা অভিযোগ করে না? একজন নির্যাতিত শিশু সবসময় সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের কাছে বিষয়টি বলতে পারে না। কারণ হতে পারে— শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষকে ভয় পাওয়া; অনেক শিশু ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়ন কী, তা বুঝতে পারে না; পরিবার তাকে বিশ্বাস করবে না—এই আশঙ্কা; প্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার বা শাস্তির ভয়; সামাজিক লজ্জা; অপরাধী ব্যক্তির প্রভাব বা ক্ষমতা; নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি কীভাবে ব্যাখ্যা করবে, তা না জানা; অভিযোগের পর কী হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা। এই কারণে শুধু “শিশুকে সাহসী হতে হবে” বললে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিষ্ঠানকেই এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে শিশুর কথা বলার সুযোগ থাকে। আইনের দৃষ্টিতে শিশুর সুরক্ষা বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য শিশু আইন, ২০১৩ রয়েছে। আইনটি শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। সরকারি আইনভান্ডারেও আইনটি ২০১৩ সালের ২৪ নম্বর আইন হিসেবে প্রকাশিত রয়েছে। কিন্তু শুধু আইন থাকলেই হবে না। আইন কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন— অভিযোগ